▌কবরের ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবন!
.
▪এক,
মৃত্যু চিরসত্য, নির্মম বাস্তবতা নাম। মৃত্যু পরবর্তী আরেকটি জীবন রয়েছে, যার নাম বারযাখী জীবন। মউতের গাড়িতে চড়ে এই বারযাখী জীবনে যেতে হয়।
আমাদের সমাজে সাধারণ মুসলমান যারা কিনা আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে গাফেল, তাঁরা এই ধারণা করেন যে, আমি যেহেতু মুসলিম, কালিমা পড়েছি, সেহেতু জাহান্নামে পুড়িয়ে একদিন না একদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা জান্নাত দিবেনই!
জানিনা কিভাবে এই চিন্তা করা সম্ভব!? এমন নয় যে, মৃত্যুর পরপরই আপনাকে জাহান্নামে পোড়ানো হবে। যদি ধরেই নিই, মহান আল্লাহ আপনাকে কিছুদিন বা কিছুকাল জাহান্নামে রাখলেন, অত:পর জান্নাতে ফিরেও আসলেন, তবুও তো আপনাকে এমন কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে যার একটি অন্যটি থেকেও ভয়ংকর! প্রথমেই মৃত্যু, যার ভয়াবহতাই জাহান্নামীদের জন্য যথেষ্ঠ। পাপাচারী ও অবিশ্বাসী ব্যক্তিরা যখন
দুনিয়ার ত্যাগ করে আখিরাতের দিকে যেতে থাকবে, তখন মৃত্যুর ফেরেশতা খসখসে কফিন নিয়ে আগমন করবে যেটা আমদানি হয়েছে জাহান্নাম থেকে। সেদিন তাঁর পাশে বসে ফেরেশতা বলবেন, “হে পাপী আত্মা! আল্লাহ তা’আলার ক্রোধ এবং রোষের দিকে ছুটে আস।” তাঁকে বলা হবে, "তোমাকে এখনই আসতে হবে এবং তোমার জন্য আল্লাহর ক্রোধ অপেক্ষা করছে। যখন মৃত্যুর ফেরেশতা এই ঘোষণা করবে, তখন তাঁর আত্মা দেহের মধ্যে ছুটে বেড়াবে আর সে বের হয়ে আসতে চাইবে না। মৃত্যুর ফেরেশতারা তখন তাঁর আত্মাকে খপ করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাবে, ভেজা পশমের মধ্য থেকে কাটাঁযুক্ত কিছুকে টেনে আনতে যেমন অবস্থা হয় ঠিক তেমন অবস্থা হবে।
---- [ সুরাহ আর-রুহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম [ রাহঃ] ব্যাখ্যা দ্রস্টব্য ]
.
▪দুই,
মৃত্যুর ভয়াবহতা শেষ না হতেই কবরের নিঃসঙ্গতা ও
ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবনের শুরু! কবর এমন একটি জায়গা যেখানে আপনার সাথে কেউ থাকবেনা, আপনি
একা, একলা একজন মানুষ কবরে শুয়ে থাকবেন। কী দিন, কী রাত! সেখানে কেবল যন্ত্রনা আর যন্ত্রনা। কষ্ট আর কষ্ট! কবরের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দুনিয়ার সমস্ত সুখ, চাকচিক্য, বিলাসিতাকে ভুলিয়ে দিবে!
আম্মাজান আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ---
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، عَنْ مُحَمَّدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَشْعَثَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، فَقَالَ: «نَعَمْ، عَذَابُ الْقَبْرِ حَقٌّ»، قَالَتْ عَائِشَةُ: فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي صَلَاةً بَعْدُ إِلَّا تَعَوَّذَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ--কে কবরের আযাব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, হ্যাঁ! কবরের আযাব সত্য। আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এরপর আমি
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এমন কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি যাতে তিনি কবরের আযাব থেকে পানাহ না চেয়েছেন। --- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ১৩০৮ ]
.
আম্মাজান আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) আরো বলেন,
أَخْبَرَنَا هَنَّادٌ، عَنْ أَبِي مُعَاوِيَةَ، عَنْ الْأَعْمَشِ، عَنْ شَقِيقٍ، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ، دَخَلَتْ يَهُودِيَّةٌ عَلَيْهَا فَاسْتَوْهَبَتْهَا شَيْئًا، فَوَهَبَتْ لَهَا عَائِشَةُ، فَقَالَتْ: أَجَارَكِ اللَّهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، قَالَتْ عَائِشَةُ: فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ، حَتَّى جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: «إِنَّهُمْ لَيُعَذَّبُونَ فِي قُبُورِهِمْ عَذَابًا تَسْمَعُهُ الْبَهَائِمُ»
এক ইয়াহূদী রমণী তার কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চাইল। তখন আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাকে ভিক্ষা দিলে সে বললোঃ আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন। আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এতে আমি চিন্তান্বিত হলাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ-
আসলে তার কাছে আমি তা বললাম। তিনি বললেন, তারা নিজ নিজ কবরে এমন আযাবের সম্মুখীন হবে যা চতুষ্পদ জন্তুসমূহ শুনতে পাবে।
---- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ২০৬৬ ]
.
আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন -
أَخْبَرَنَا سُوَيْدُ بْنُ نَصْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعَ صَوْتًا مِنْ قَبْرٍ فَقَالَ: «مَتَى مَاتَ هَذَا؟» قَالُوا: مَاتَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَسُرَّ بِذَلِكَ، وَقَالَ: «لَوْلَا أَنْ لَا تَدَافَنُوا لَدَعَوْتُ اللَّهَ أَنْ يُسْمِعَكُمْ عَذَابَ الْقَبْرِ»
রাসূলুল্লাহ ﷺ-একটি কবর থেকে আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, এ ব্যক্তি কখন মৃত্যুবরণ করেছে? সাহাবীগণ বললেন, সে জাহিলিয়্যাত যুগে মৃত্যুবরণ করেছে। তাতে তিনি খুশী হয়ে বললেন, যদি আমি আশংকা না করতাম যে, তোমরা ভয়ে একে অপরকে দাফন করা ছেড়ে দিবে তাহলে আমি তোমাদের কবরের আযাব (আযাবের আওয়াজ) শুনানোর জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করতাম।
--- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ২০৫৮ ]
.
▪তিন,
সত্যিই কবর অনেক ভয়ানক জায়গা! সেখানে আটকে গেলেই আপনি বরবাদ! কবরের আজাব থেকে মুক্তি মানেই সফলতার দ্বার উন্মোচিত হয়ে যাওয়া।
উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুক্তদাস হানী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ---
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ يُوسُفَ، حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بَحِيرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ هَانِئًا، مَوْلَى عُثْمَانَ قَالَ كَانَ عُثْمَانُ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ فَقِيلَ لَهُ تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلاَ تَبْكِي وَتَبْكِي مِنْ هَذَا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنَازِلِ الآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ " . قَالَ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلاَّ وَالْقَبْرُ أَفْظَعُ مِنْهُ " . قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ هِشَامِ بْنِ يُوسُفَ .
উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কোন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তার দাড়ি ভিজে যেত। তাকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ এই কবর দর্শনে এত বেশি কাঁদেন কেন?
তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ- বলেছেন: আখিরাতের মানযিলসমূহের (প্রাসাদ) মধ্যে কবর হলো প্রথম মানযিল। এখান হতে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান হতে মুক্তি না পেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানযিলগুলো আরো বেশি কঠিন হবে। তিনি (উসমান) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ- আরো বলেছেন,
আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ংকর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি।
--- [ ইবনু মা-জাহ : ৪২৬৭, তিরমিযী : ২৩০৮ ]
.
উমার ইবনুল খাত্তাব [ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ] বলেন,
“যার হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম ---
যদি আমার কাছে দুনিয়ার সকল স্বর্ণ এবং রৌপ্য থাকতো, আমি সেগুলোর বিনিময়ে হলেও মৃত্যুর পরে যে ভয়াবহতা রয়েছে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম।”
---- [ সাহীহ আত-তাওতিক ফি সীরাত ওয়া
হায়াত আল-ফারুক : পৃ ৩৮৩ ]
.
এই দীর্ঘ যন্ত্রণাময় জীবনের অবসান ঘটবে শিংগার বিকট শব্দে। রূহসমূহ মৌমাছির মতো বের হয়ে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেবে। অত:পর রুহসমূহ দেহে প্রবেশ করবে। কিয়ামাত! অত:পর হিসাবের জন্য হাশরের মাঠে অপমান আর লাঞ্চনার অপেক্ষা। ভাববেন না যে এখানেই শেষ।
এবার মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন
করবেন। ছোট বড় কিছুই সেদিন বাদ যাবে না।
সেখানে মানুষের আমলনামা প্রকাশ করা হবে লিখিত
আকারে। এর পরপরই আপনাকে, আমাকে মুখোমুখি করা হবে পুলসিরাতের। পুলসিরাতের উপর দিয়ে আমাদের সকলকেই সেদিন অতিক্রম করতে হবে। নেককাররা বিদ্যুৎ, বাতাস ও দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে পার হয়ে যাবে। আবার কেউ পার হবে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে। অত:পর কেউ সামান্য আঁচাড় খেয়ে, কেউ আহত হয়ে,কেউ হুমড়ী খেয়ে পড়ে যাবে জাহান্নামে। এমনকি সর্বশেষ, ব্যক্তিকে টেনে টেনে জাহান্নামে নেয়া হবে।
.
চিন্তা করুনতো, সেদিন কি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে! তারপরও কি জাহান্নামের ঝুঁকি নিবেন ? তারপরও কি কিছুক্ষণ বা কিছুদিন জাহান্নামে থাকার মত দুঃসাহস দেখাবেন!?
প্রিয় ভাই আমার ! জাহান্নামে কিছুকাল থাকা তো দূরের কথা, কিছুক্ষণ থাকাও আমাদের পক্ষে সম্বব নয়। ঐ আগুনের লেলিহান উত্তাপ কলিজা হালাক করে দিবে । এখনো সময় আছে, দ্রুত আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসুন।
পরিশেষে দো'আ করি - আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদেরকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করুন যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। আমীন।
.
▪সংকলক :
আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী,
আখতার বিন আমীর।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
Categories:
islamic video

0 comments: