নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ রয়েছে, একত্ববাদী এমন তিনটি ধর্ম-ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম। এ সকল ধর্মে বিশ্বাসীদেরকে তাদের ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান। যে ধর্মে যে বিশ্বাসী তাদের কাছে তিনি যে-ই হােন-না-কেন, তাঁর ধর্মগ্রন্থ তাঁর বিশ্বাসের বুনিয়াদ, নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থকে আসমানী ওহীর লিপিবদ্ধ রূপ বলে বিবেচনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এ ধরনের ওহী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং হযরত মুসা (আঃ) সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং ওহী হযরত ঈসা (আঃ) লাভ করেন ফাদার বা পিতার নামে আর হযরত মােহাম্মদ (দঃ) লাভ করেছিলেন প্রধান ফিরিস্তা জিব্রাইলের মাধ্যমে।
ধর্মীয় ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিচারে তাওরাত, জবুর, ইঞ্জিল অর্থাৎ বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়ম এবং কোরআন একই ধরনের ওহী বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ধর্মগ্রন্থ।
যদিও বর্তমান সভ্য-জগতের সাল-গণনার প্রথম শতকে এবং আরও অনেক আগেও বাইবেল’ শব্দটি কারও জানা ছিল না। অর্থাৎ কোন পুস্তককে, নাম বাইবেল ছিল না। অবশ্য, চতুর্থ শতকে কনস্টান্টিপােলের (বর্তমানে যে-স্থান ইস্তাম্বুল) একজন গােষ্ঠীপতি জন ক্রাইসােটর ইহুদিদের দ্বারা সংগৃহীত পুঁথিগুলােকে বিবলিয়া' অর্থাৎ বুকস' (গ্রন্থমালা) বলে উল্লেখ করেছেন।
বাইবেলের দুটি অংশ ঃ প্রথম অংশকে বলা হয় পুরাতন নিয়ম' (The old Testament)। এতে রয়েছে, যীশুর অবর্তমানে বিভিন্ন লেখক কর্তৃক যীশুর জীবনী, উপদেশাবলী এবং প্রতি প্রত্যাদিষ্ট ঐশীবাণীসমূহের অংশবিশেষ প্রসঙ্গক্রমে বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্নভাবে।
এখন থেকে সােয়াশ’ বছর আগে থেকে আরম্ভ করে এখনপর্যন্ত অনেক জ্ঞানীব্যক্তি বিশুদ্ধ খ্রিস্টান হয়েও বাইবেলের উক্তিগুলােকে ঠিক আপ্তবাক্য বলে মেনে না নিয়ে, নিজেদের বিচার-বুদ্ধির আলােকে ক্রমাগত তথ্য অনুসন্ধান করতে করতে সুসমাচার সম্বন্ধে অনেক নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। যা আপ্তবাক্যের চেয়েও নির্ভরযােগ্য।
তাঁদের সকলের সিদ্ধান্ত সবসময় একইরকম না হলেও তা থেকে মােটামুটি ধারণা জন্মে যে, বাইবেলের নতুন নিয়ম ‘পুরাতন নিয়ম'-এর বৈপরীত্য ছাড়াও নানারকম তর্ক-বিতর্ক বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি করে।
এই পুস্তকে কোনাে ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মাবলম্বীকে বা তাঁর বা তাদের বিশ্বাসকে আঘাত হানার প্রয়াস চালানাে হয়নি বরং বিশ্বাস করে নিতে দ্বিধা নেই একত্ববাদী ধর্মাবলম্বীদের নিকট অবশ্যই অনেক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ধর্মগ্রন্থ এসেছে।
যদিও মুসলমানেরা এই নীতি মেনে চলেন, কিন্তু কোরআনকে পাশ্চাত্যের ইহুদী-খ্রিস্টান সংখ্যাগুরু সমাজ প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চান না। ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে পরস্পরের এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, খুব সম্ভবত এ থেকেই কারাে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, একটি ধর্মীয় সমাজ অপর ধর্মীয় সমাজ সম্পর্কে কি ধরনের মনােভাব পােষণ করেন। ইহুদিদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিব্রু ভাষার বাইবেল। উল্লেখ্য, হিব্রু বাইবেল খ্রিস্টানদের বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত ‘ওন্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন নিয়ম’ থেকে আলাদা।
খ্রিস্টানরা এই ‘ওল্ড টেস্টামেন্টে বেশ কয়েকটি অধ্যায় সংযােজন করেছেন যা হিব্রু বাইবেলে অনুপস্থিত। এই সংযােজনা কিন্তু বাস্তবে ইহুদি মতবাদে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটিয়েছে বলে মনে করার কোনাে কারণ নেই। কেননা, ইহুদিরা নিজস্ব হিব্রু বাইবেলের পরে আর কোনাে ধর্মগ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়ার কথা অস্বীকার করেন। হিব্রু বাইবেল যেমনটি ছিল তেমনইভাবে তাকে গ্রহণ করা হলেও এরসঙ্গে খ্রিস্টানরা আরও কিছু নতুন অধ্যায় সংযােজন করেছেন। যদিও খ্রিস্টানরা যীশুর ধর্মপ্রচারের সাথে পরিচিত সবগুলাে রচনাকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেননি। যীশুর জীবনী ও শিক্ষা-সংক্রান্ত পুস্তকের সংখ্যা কম ছিল না, তবুও নিজেদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গির্জার পুরােহিত-অধিকারীরা এসব থেকে যাচাই-বাছাই ও কাট-ছাঁট করে শুধু কয়েকটি রচনাকে ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দিয়েছেন। এভাবে, কিছুসংখ্যক রচনা বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে প্রামাণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বলে পরিচিত চারটি গসপেল বা সুসমাচার। খ্রিস্টানরাও যীশু এবং তাঁর প্রেরিতদের পর আর কোনাে প্রত্যাদেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। তাই কোরআন তাদের কাছে বাতিল বলে গণ্য।
যীশুখ্রিস্টের ছশ বছর পর কোরআনের বাণীসমূহ অবতীর্ণ হয়, তাওরাত ও গসপেলের (ইঞ্জিল) বহু তথ্য ও পরিসংখ্যানের উল্লেখ ছাড়াও কোরআনে তাওরাত ও ইঞ্জিলের বহুল উদ্ধৃতি বিদ্যমান। কোরআন ঃ ৪ ঃ ১৩৬-এর মাধ্যমে
ইতিপূর্বেকার সবগুলাে আসমানী কিতাবের উপর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে। তাছাড়াও, কোরআন অন্যান্য পয়গম্বর যেমনঃ যীশু বা হযরত ঈসা, হযরত মুসা ও তার পরবর্তী নবীদের এবং তাঁদের ওপর অবতীর্ণ হওয়া আল্লাহর বাণী সম্পর্কে সবিশেষ গুরুত্ব আরােপ করেছে। বিশেষ এক মর্যাদা দেয়া হয়েছে যীশু বা হযরত ঈসা (আঃ)-কে। বাইবেলের মতাে কোরআনও তাঁর জন্মকে অতি-প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে । কোরআনে যীশুমাতা মেরী বা হযরত মরিয়ম বিশেষ মর্যাদার আসনে আসীন। এমনকি কোরআনের ১৯নং সূরার নামকরণ করা হয়েছে যীমাতার নামানুসারে
মরিয়ম।
সাধারণভাবে পূর্ববর্ণিত তথ্যসমূহ পাশ্চাত্যের লােকজনের অজানা। যদিও, তাই বলে বিস্ময়ের কিছু নেই, পাশ্চাত্য জগতে পুরুষানুক্রমে এমনভাবে এই শিক্ষাই দিয়ে আসা হচ্ছে। এক্ষেত্রে, তাঁদের অন্যতম প্রচারণা ইসলাম ধর্ম সম্পূর্ণভাবে একজন মানুষের সৃষ্টি এবং এই ধর্মের প্রবর্তনায় গড বা বিধাতার (খ্রিস্টীয় অর্থে) কোনাে ভূমিকা নেই।
| এখন বহু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ইসলামের দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে আগ্রহী হলেও তারা কখনাে ইসলামের ওহী বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণী-সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের তেমন কোনাে আগ্রহ অনুভব করেননি। অথচ, তা করা তাদের উচিত ।
ড. মরিস বুকাইলি বলেন, “যখন আমি বাইবেল ও কোরআনের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের জন্য খ্রিস্টান মহলের সাথে মত বিনিময়ের চেষ্টা চালিয়েছিলাম, তখন এই অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, মুসলমানদের কী ঘৃণার চোখেই না দেখে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীগণ।”
ড. মরিস বুকাইলি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁরা চিরাচরিত পদ্ধতিতেই কোরআনের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছেন। বিভিন্নবিষয়ে কোরআনের যে বক্তব্য, তা গ্রহণ করা তাে দূরের কথা, এতদসংক্রান্ত কোনাে বিষয়ে কোরআনের প্রতি সামান্য আকার-ইঙ্গিতও তারা আমলে নিতে রাজি হননি। কোরআনের কোনাে উদ্ধৃতি তাঁদের কাছে দেয়া যেন শয়তানের বরাত দিয়ে কথা বলার সমান।
যাহােক, এখন খ্রিস্টান-জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ-বিষয়ে বেশকিছু উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভ্যাটিক্যানের নন-ক্রিশ্চিয়ান অ্যাফেয়ার্স দফতর থেকে দ্বিতীয় ভ্যাটিক্যান কাউন্সিলের পর একটি তথ্যমূলক পুস্তিকা ।
প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফরাসি নামের বাংলা হচ্ছে মুসলিম-খ্রিস্টান আলাপ আলােচনায় দিক-নির্দেশিকা'। ১৯৭০ সনে ফরাসি ভাষায় এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় রােমের ‘আনকোরা” নামের এক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে।
এই পুস্তকে মুসলমানদের ব্যাপারে ভ্যাটিক্যানের দৃষ্টিভঙ্গি যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে তার পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ, এই পুস্তকে ইসলাম সম্পর্কে খ্রিস্টানদের প্রতি অতীত থেকে পাওয়া যাবতীয় বাতিল ধারণা ও কুসংস্কার এবং বিদ্বেষপ্রসূত বিকৃত মতামত পরিহারের জন্য বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়,
ভ্যাটিক্যান থেকে সম্প্রচারিত এই দলিলে স্বীকৃত হয়েছে ?
“অতীতে মুসলমানদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে এবং সেজন্য খ্রিস্টবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত পাশ্চাত্য সমাজই দায়ী। তাছাড়া, খ্রিস্টানদের মধ্যে যে-সব ভুল ধারণা রয়েছে মুসলমানদের অদৃষ্টবাদ, ইসলামিক বিধি-বিধান, তাঁদের রক্ষণশীলতা সম্পর্কে সে সব নিয়েও এই বইয়ে সমালােচনা করা হয়েছে। এই পুস্তকে স্রষ্টার একত্বের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তােলার উপর গুরুত্ব আরােপসহ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে যে, ১৯৬৯ সনের মার্চ মাসে কার্ডিনাল কোয়েনিং এক সরকারি বৈঠকে যােগদানের জন্য কায়রাে শহরে গিয়ে আল আজহার মুসলিম ইউনিভার্সিটির জামে মসজিদে এই ঐক্য গড়ে তােলার আহবান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, তাঁর সেই আহবানে শ্রোতারা অবাক হয়ে গিয়েছিল। এই পুস্তকে এও বলা হয়েছে যে, ১৯৬৭ সনে ভ্যাটিক্যান দফতর থেকে রমজান শেষে যথাযথ ধর্মীয় গুরুত্ব সহকারে মুসলমানদের প্রতি পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের জন্য খ্রিস্টানদের প্রতি আহবান জানানো হয়েছিল। রােমান ক্যাথলিক বিশ্বাস ও ইসলামের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক গড়ে তােলার ব্যাপারে এই যে পদক্ষেপ, তা কিন্তু এখানেই থামেনি, বরং পরবর্তীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে তা আরাে গতিশীল ও আরাে সুদৃঢ় করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অবশ্য, সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশনের দ্বারা তাে বটেই অন্যান্য প্রচারমাধ্যমের সকল সুযােগ-সুবিধা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য জগতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এইসব ঘটনা তেমন কোনাে প্রচার পায়নি। ভ্যাটিক্যানের নন-ক্রিশ্চিয়ান এ্যাফেয়ার্স দফতরের প্রেসিডেন্ট কার্ডিনাল পিগনােডেলি ১৯৭৪ সনের ২৪ এপ্রিল সরকারি সফরে সৌদি আরব যান এবং বাদশাহ ফয়সালের সাথে সাক্ষাৎ করেন, এই
সংবাদটিও পত্র-পত্রিকায় তেমন কোনাে প্রচার পায়নি। এ সম্পর্কে ফরাসি সংবাদপত্র লে মডেতে কয়েক ছত্র সংবাদ প্রকাশ করেছিল, তারিখটি ২৫শে এপ্রিল ১৯৭৪। ওই সংবাদসূত্রে জানা যায়, ইসলামী বিশ্বের প্রধানতম নেতা মহামান্য বাদশাহ ফয়সালের নিকট মহামান্য পােপ ৪র্থ পল এই মর্মে এক বাণী পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, এক আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে ইসলামী বিশ্ব ও খ্রিস্টান-জগৎ ঐক্য গড়ে তুলতে পারে।”
ঘটনার গুরুত্ব এই বাণীর মর্ম থেকেই উপলব্ধি করা যায়।
উল্লেখ্য, এর কয়েক মাস পর সৌদী আরবের গ্র্যান্ড উলেমা এক সরকারি সফরে ভ্যাটিক্যানে আসেন এবং পােপ তাকে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। এই উপলক্ষে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে এক আলােচনা-বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলােচনার শিরােনাম ছিল ইসলামে মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকার। ভ্যাটিক্যানের সংবাদপত্র অবজারভেটর রােমানাে’ ১৯৭৪ সনের ২৬ অক্টোবর প্রথম পৃষ্ঠায় এই ঐতিহাসিক বৈঠকের বিবরণ প্রকাশ করে। | উল্লিখিত বৈঠকের সমাপ্তি অধিবেশনে রােমের সাইনড অব বিশপবর্গ উপস্থিত ছিলেন কিন্তু এই সমাপ্তি অধিবেশনের সংবাদটি প্রথম অধিবেশনের তুলনায় ছােট করে ছেপেছিল।
| সৌদি আরবের গ্রান্ড ওলেমাকে এরপর সংবর্ধনা জানান, জেনেভা গির্জাসমূহের এডুমেনিকাল কাউন্সিল এবং স্ট্রাসবুর্গের লর্ড-বিশপ মহামতি এলাচিংগার। বিশপ তাঁর উপস্থিতিতেই গ্রান্ড উলেমাকে গির্জাতে জোহরের নামায আদায় করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। অনুমান করা চলে, ধর্মীয় গুরুত্ব হিসেবে নয় বরং বৈচিত্র্যপূর্ণ ঘটনার বিবরণী হিসেবে সংবাদপত্রগুলােতে ওইসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। কেননা, এসব ঘটনার মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলাে সম্পর্কে ড. মরিস বুকাইলি যাদেরই প্রশ্ন করেছেন, জেনেছেন, তাঁদের অনেকেই এর গুরুত্ব সম্পর্কে তেমন সচেতন নন।
ইসলাম সম্পর্কে পােপ চতুর্থ পল এই যে উদার দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তা দুই ধর্মের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তােলার পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে যা দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
পােপ নিজেই এ ব্যাপারে বলেন যে, “এক আল্লাহর উপাসনার ভিত্তিতে খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তােলার ব্যাপারে এক সুগভীর বিশ্বাস
তাকে পরিচালিত করেছিল।”
ক্যাথলিক চার্চের প্রধানের কাছ থেকে মুসলমানদের জন্য এরকম মানসিক ভাবাবেগের সত্যি প্রয়ােজন রয়েছে। কেননা, বেশিরভাগ খ্রিস্টানই বড় হয়ে থাকেন ইসলাম-বিরােধিতার বিদ্বেষপূর্ণ এক উদ্দীপনার মধ্যে। ফলে, তাঁরা আদর্শের প্রশ্নে ইসলামের নামগন্ধ পর্যন্ত বরদাশত করতে রাজি নন। ভ্যাটিক্যান থেকে প্রকাশিত উল্লিখিত পুস্তকে এ জন্যে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। | এ কথা অনস্বীকার্য নয়, উল্লিখিত বিদ্বেষপূর্ণ মনােভাবের জন্যেই সত্যিকারার্থে ইসলাম যে কি, তা বেশিরভাগ খ্রিস্টান সম্পূর্ণভাবেই অজ্ঞাত থাকেন। একই কারণে ইসলামী-প্রত্যাদেশ সম্পর্কে তাদের ভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা রয়ে
গেছে। | যাহােক, স্বাভাবিকভাবেই একত্ববাদী কোনাে একটি ধর্মের প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত কোনাে বিষয় যখন পর্যালােচিত হয় তখন এ বিষয়ে অপর দুই একত্ববাদী ধর্মের বক্তব্য কি, তার তুলনামূলক আলােচনাও এসে পড়ে।
তাছাড়া, যেকোনাে সমস্যার সার্বিক বিচার-পর্যালােচনা বিচ্ছিন্ন কোনাে আলােচনার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়। এ কারণে ড. মরিস বুকাইলি মন্তব্য করেন,
“যেসব বিশেষ বিষয়ে ধর্মীয় গ্রন্থসমূহের বক্তব্যের সাথে বিশ-শতকের বৈজ্ঞানিক সত্যের বিরােধ রয়েছে বলে মনে করা হয়, সেসবের পর্যালােচনায়ও উল্লিখিত তিন ধর্মের কথা এসে যায়। সকলের এই সত্যও অনুধাবন করা প্রয়ােজন যে, বস্তুবাদের সুতীব্র অভিযানের মুখে তিন ধর্মই আজ হুমকির সম্মুখীন, এই যখন অবস্থা, তখন পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গুণে ধর্ম তিনটি সহজেই সমবেতভাবে একটি সুদৃঢ় প্রতিরােধ-প্রাচীন গড়ে তুলতে পারে । বিজ্ঞান এবং ধর্ম পরস্পরবিরােধী বলে যে ধারণা, তা ইহুদী ও খ্রিস্টান-অধ্যুষিত দেশগুলােতে যেমন, তেমনি মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনাে মহলে বেশ জোরদার । কেন এই অবস্থা- সে প্রশ্নের সার্বিক জবাব খুঁজে পাওয়ার জন্য দীর্ঘতর আলােচনা প্রয়ােজন।
প্রকৃতপক্ষে, এই পর্যালােচনা তথা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে অগ্রসর হওয়ার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে নিতে হবে। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, ধর্মগ্রন্থের লিপিবদ্ধবাণীসমূহ কতােটা সঠিক? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যে অবস্থা ও যে পরিবেশে এসব বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছিল তা যেমন পরীক্ষণীয়; তেমনি এও পরীক্ষণীয় যে, কার মাধ্যমে বা কোন পথে এসব বাণী মানুষের কাছে পৌঁছেছে। ১৬
পাশ্চাত্য জগতে বাইবেলের সমালােচনামূলক গবেষণা একদম হালের ঘটনা । শত শত বছর ধরে সেখানকার মানুষ নতুন ও পুরাতন নিয়ম তথা বাইবেলকে যখন যে অবস্থায় পেয়েছে, তখন সে অবস্থায় তা গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত থেকেছে। এই ধর্মগ্রন্থ তারা যেমন ভক্তিভরে পাঠ করেছে, তেমনি টীকা-টিপ্পনী সংযােজন করে সে গ্রন্থের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশােধনেরও প্রয়াস চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, ধর্মগ্রন্থের বিরুদ্ধে সামান্যতম সমালােচনাকেও তারা ‘পাপ' বলে গণ্য করতে ছাড়েননি। এই বিষয়ে, পুরােহিতেরা ছিলেন সবসময়ই সবার উপরে। কেননা, তাঁদের পক্ষে সম্পূর্ণ বাইবেল ভালােভাবে জানার সুযােগ ছিল বেশি। পক্ষান্তরে, বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ধর্মীয় ভাষণ কিংবা বিভিন্ন উপাসনা উপলক্ষে বাইবেলের নির্বাচিত অংশের পাঠ শুনেই নিজেদের ধন্য মনে করেছেন।
কোনাে ধর্মগ্রন্থের উপর বিশেষভাবে কোনাে গবেষণা পরিচালনাকালে দেখা গেছে যে, এতদ্সংক্রান্ত কোনাে সমস্যা যা কখনাে কখনাে জটিল হয়ে দাঁড়ায়, তার মূল উদ্ঘাটন ও প্রকৃতি বিশ্লেষণের জন্য সেই গ্রন্থের পাঠ বা বাণীর দোষ গুণ বিচারের প্রয়ােজন সর্বাধিক। কিন্তু বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের গুণাগুণ বিচারের নামে তথাকথিত গবেষণামূলক যেসব পুঁথি-পুস্তক বাজারে রয়েছে সেগুলাে পাঠ করলে নিরাশ হতে হয় ।
কারণ, সংশ্লিষ্ট কোনাে সমস্যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এইসব পুস্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, লেখক যেন সেই সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারলেই বাঁচেন। এসব ক্ষেত্রে যারা ভাবনা-চিন্তার ক্ষমতা রাখেন ও নিরপেক্ষ রায় প্রদানের সাহস দেখাতে পারেন, তারাও কিন্তু নিজেদের আজগুবি ধারণা ও স্ববিরােধিতা ঢেকে রাখতে পারেন না। আরাে দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, যতাে তর্কই হােক আর যতাে যুক্তিই দেখানাে হােক, সেসবের মােকাবেলায় অনেকেই নির্দ্বিধায় বাইবেলের অংশবিশেষকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পেশ করেন। তাঁরা বুঝতেও চান না যে, বাইবেলের এইসব বক্তব্য কতােটা ভ্রান্ত ও ধাঁধায় পূর্ণ । তাছাড়া, এইসব লেখক একবারও ভেবে দেখেন না
যে, তাদের এই ধরনের যুক্তিহীনতা স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী শিক্ষিত লােকদের মনােভাবে কি বিরূপ ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
বরং, এমনও দেখা গেছে, সামান্য কিছুসংখ্যক লােকই এ যাবত বাইবেলের এসব গােলকধাধা চিহ্নিত করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। পক্ষান্তরে, বেশির ভাগ খ্রিস্টান তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা সত্ত্বেও বাইবেলের ওইসব অসঙ্গতির ব্যাপারে নির্বিকার থাকেন।
যদিও, সেসব অসঙ্গতি একেবারেই মৌলিক বিষয়-সংক্রান্ত। উল্লেখ্য, বাইবেলের নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত সুসমাচারসমূহের সাথে তুলনীয় হতে পারে, এমন ধর্মগ্রন্থ মুসলমানদেরও রয়েছে, তাহলে ও হাদীস গ্রন্থ। হাদীস হলাে, মােহাম্মদের (দঃ) বক্তব্য ও কার্যবিবরণীর সংকলন। যীশুর বাণী ও কর্মবিবরণীর সংকলন হিসেবে বাইবেল। অর্থাৎ, নতুন নিয়মের সুসমাচারসমূহ : ইঞ্জিল হলাে খ্রিস্টানদের অনুরূপ ধর্মগ্রন্থ। যীশুর আবির্ভাবের কয়েক দশক পরে যেমন বাইবেলের সুসমাচারসমূহ লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি হাদীসও লিপিবদ্ধ হয়েছিল। মােহাম্মদের (দঃ) মৃত্যুর কয়েক দশক পর হাদীস ও বাইবেল উভয়ের মধ্যেই রয়েছে অতীতের ঘটনাবলীর মানবীয় সাক্ষ্য। পক্ষান্তরে, অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রামাণ্য বাইবেলের (সুসমাচারসমূহ) রচয়িতারা নিজেরা কিন্তু লিপিবদ্ধ ঘটনার কিংবা কোনাে বিবরণের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না।
এই পুস্তকে আলােচিত হাদীসের সংকলকদের ব্যাপারেও একথা প্রযােজ্য।
এখানেই হাদীস ও বাইবেলের তুলনামূলক আলােচনার শেষ। হাদীসসমূহের সঠিকত্ব বা নির্ভুলতা নিয়ে অতীতে বহু বিচার, বিশ্লেষণ ও পর্যালােচনা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। পক্ষান্তরে, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকেই গির্জার অধিকারীবৃন্দ বহুসংখ্যক সুসমাচার থেকে যাচাই-বাছাই করে শুধু চারটি সুসমাচারকে প্রামাণ্য বলে চূড়ান্তভাবে রায় দিয়েছেন। অথচ, বাইবেলের নতুন নিয়মে সংকলিত সেই চারটি প্রামাণ্য সুসমাচারে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অনেক বিষয়ে তেমন কোনাে ঐকমত্য সৃষ্টি হয় না। তবুও, ওই চারটিকে ‘প্রামাণ্য বলে গ্রহণ করে বাদবাকি সুসমাচারকে বাতিল বলে রায় দেয়া হয় । এভাবে বাতিলকরণের এই প্রক্রিয়া থেকেই এ্যাপোেক্রাইফা টার্মের উৎপত্তি।
ধর্মগ্রন্থের ব্যাপারে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের মধ্যে আর একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান ও খ্রিস্টানদের এমন কোনাে ধর্মগ্রন্থ নেই যার বাণীসমূহ সরাসরি ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত এবং যে গ্রন্থে বাণীসমূহ হুবহু লিপিবদ্ধ। পক্ষান্ত রে, ইসলামের কোরআন এই চরিত্রের ধর্মগ্রন্থ, এই গ্রন্থ সরাসরিভাবে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত। | কোরআন প্রধান ফিরিশতা জিব্রাঈলের মাধ্যমে মােহাম্মদ (দঃ) কর্তৃক প্রাপ্ত ওহী তথা আল্লাহর বাণী। প্রত্যাদেশপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ওহীর বাণীসমূহ লিখে রাখা হত; বিশ্বাসীরা তা কণ্ঠস্থ করে ফেলতেন এবং নামাজে সেইসব বাণী বা
আয়াত তেলাওয়াত করা হত যা এখনাে হয়। বিশেষত, প্রাপ্ত বাণীসমূহ রমজান মাসে অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে তেলাওয়াতের ব্যবস্থা থাকতাে। এখনাে সেই ধারা চালু রয়েছে। মােহাম্মদ (দঃ) নিজেই প্রাপ্ত বাণীসমূহ বিভিন্ন সূরায় ভাগ করে গেছেন.............................
book mocup