Saturday, 10 August 2019

কবরের ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবন!

কবরের ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবন!

▌কবরের ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবন!
.
এক,
মৃত্যু চিরসত্য, নির্মম বাস্তবতা নাম। মৃত্যু পরবর্তী আরেকটি জীবন রয়েছে, যার নাম বারযাখী জীবন। মউতের গাড়িতে চড়ে এই বারযাখী জীবনে যেতে হয়। 
আমাদের সমাজে সাধারণ মুসলমান যারা কিনা আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে গাফেল, তাঁরা এই ধারণা করেন যে, আমি যেহেতু মুসলিম, কালিমা পড়েছি, সেহেতু জাহান্নামে পুড়িয়ে একদিন না একদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা জান্নাত দিবেনই!

জানিনা কিভাবে এই চিন্তা করা সম্ভব!? এমন নয় যে, মৃত্যুর পরপরই আপনাকে জাহান্নামে পোড়ানো হবে। যদি ধরেই নিই, মহান আল্লাহ আপনাকে কিছুদিন বা কিছুকাল জাহান্নামে রাখলেন, অত:পর জান্নাতে ফিরেও আসলেন, তবুও তো আপনাকে এমন কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে যার একটি অন্যটি থেকেও ভয়ংকর! প্রথমেই মৃত্যু, যার ভয়াবহতাই জাহান্নামীদের জন্য যথেষ্ঠ। পাপাচারী ও অবিশ্বাসী ব্যক্তিরা যখন
দুনিয়ার ত্যাগ করে আখিরাতের দিকে যেতে থাকবে, তখন মৃত্যুর ফেরেশতা খসখসে কফিন নিয়ে আগমন করবে যেটা আমদানি হয়েছে জাহান্নাম থেকে। সেদিন তাঁর পাশে বসে ফেরেশতা বলবেন, “হে পাপী আত্মা! আল্লাহ তা’আলার ক্রোধ এবং রোষের দিকে ছুটে আস।” তাঁকে বলা হবে, "তোমাকে এখনই আসতে হবে এবং তোমার জন্য আল্লাহর ক্রোধ অপেক্ষা করছে। যখন মৃত্যুর ফেরেশতা এই ঘোষণা করবে, তখন তাঁর আত্মা দেহের মধ্যে ছুটে বেড়াবে আর সে বের হয়ে আসতে চাইবে না। মৃত্যুর ফেরেশতারা তখন তাঁর আত্মাকে খপ করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাবে, ভেজা পশমের মধ্য থেকে কাটাঁযুক্ত কিছুকে টেনে আনতে যেমন অবস্থা হয় ঠিক তেমন অবস্থা হবে। 
---- [ সুরাহ আর-রুহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম [ রাহঃ] ব্যাখ্যা দ্রস্টব্য ]
.

দুই,
মৃত্যুর ভয়াবহতা শেষ না হতেই কবরের নিঃসঙ্গতা ও
ভয়ানক দুর্দশাগ্রস্থ জীবনের শুরু! কবর এমন একটি জায়গা যেখানে আপনার সাথে কেউ থাকবেনা, আপনি 
একা, একলা একজন মানুষ কবরে শুয়ে থাকবেন। কী দিন, কী রাত! সেখানে কেবল যন্ত্রনা আর যন্ত্রনা। কষ্ট আর কষ্ট! কবরের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি দুনিয়ার সমস্ত সুখ, চাকচিক্য, বিলাসিতাকে ভুলিয়ে দিবে!

আম্মাজান আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ---
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، عَنْ مُحَمَّدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَشْعَثَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، فَقَالَ: «نَعَمْ، عَذَابُ الْقَبْرِ حَقٌّ»، قَالَتْ عَائِشَةُ: فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي صَلَاةً بَعْدُ إِلَّا تَعَوَّذَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ--কে কবরের আযাব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, হ্যাঁ! কবরের আযাব সত্য। আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এরপর আমি 
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এমন কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি যাতে তিনি কবরের আযাব থেকে পানাহ না চেয়েছেন। --- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ১৩০৮ ]
.

আম্মাজান আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) আরো বলেন,
أَخْبَرَنَا هَنَّادٌ، عَنْ أَبِي مُعَاوِيَةَ، عَنْ الْأَعْمَشِ، عَنْ شَقِيقٍ، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ، دَخَلَتْ يَهُودِيَّةٌ عَلَيْهَا فَاسْتَوْهَبَتْهَا شَيْئًا، فَوَهَبَتْ لَهَا عَائِشَةُ، فَقَالَتْ: أَجَارَكِ اللَّهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، قَالَتْ عَائِشَةُ: فَوَقَعَ فِي نَفْسِي مِنْ ذَلِكَ، حَتَّى جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: «إِنَّهُمْ لَيُعَذَّبُونَ فِي قُبُورِهِمْ عَذَابًا تَسْمَعُهُ الْبَهَائِمُ»
এক ইয়াহূদী রমণী তার কাছে এসে কিছু ভিক্ষা চাইল। তখন আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাকে ভিক্ষা দিলে সে বললোঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা তোমাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন। আইশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এতে আমি চিন্তান্বিত হলাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ-
আসলে তার কাছে আমি তা বললাম। তিনি বললেন, তারা নিজ নিজ কবরে এমন আযাবের সম্মুখীন হবে যা চতুষ্পদ জন্তুসমূহ শুনতে পাবে।
---- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ২০৬৬ ]
.

আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন -
أَخْبَرَنَا سُوَيْدُ بْنُ نَصْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعَ صَوْتًا مِنْ قَبْرٍ فَقَالَ: «مَتَى مَاتَ هَذَا؟» قَالُوا: مَاتَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَسُرَّ بِذَلِكَ، وَقَالَ: «لَوْلَا أَنْ لَا تَدَافَنُوا لَدَعَوْتُ اللَّهَ أَنْ يُسْمِعَكُمْ عَذَابَ الْقَبْرِ»
রাসূলুল্লাহ ﷺ-একটি কবর থেকে আওয়াজ শুনতে পেয়ে বললেন, এ ব্যক্তি কখন মৃত্যুবরণ করেছে? সাহাবীগণ বললেন, সে জাহিলিয়্যাত যুগে মৃত্যুবরণ করেছে। তাতে তিনি খুশী হয়ে বললেন, যদি আমি আশংকা না করতাম যে, তোমরা ভয়ে একে অপরকে দাফন করা ছেড়ে দিবে তাহলে আমি তোমাদের কবরের আযাব (আযাবের আওয়াজ) শুনানোর জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করতাম।
--- [ সুনানে আন-নাসায়ী : ২০৫৮ ]
.

তিন,
সত্যিই কবর অনেক ভয়ানক জায়গা! সেখানে আটকে গেলেই আপনি বরবাদ! কবরের আজাব থেকে মুক্তি মানেই সফলতার দ্বার উন্মোচিত হয়ে যাওয়া।
উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর মুক্তদাস হানী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ---
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ يُوسُفَ، حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بَحِيرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ هَانِئًا، مَوْلَى عُثْمَانَ قَالَ كَانَ عُثْمَانُ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ فَقِيلَ لَهُ تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلاَ تَبْكِي وَتَبْكِي مِنْ هَذَا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏"‏ إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنَازِلِ الآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلاَّ وَالْقَبْرُ أَفْظَعُ مِنْهُ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ هِشَامِ بْنِ يُوسُفَ ‏.‏
উসমান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কোন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তার দাড়ি ভিজে যেত। তাকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ এই কবর দর্শনে এত বেশি কাঁদেন কেন?
তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ- বলেছেন: আখিরাতের মানযিলসমূহের (প্রাসাদ) মধ্যে কবর হলো প্রথম মানযিল। এখান হতে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান হতে মুক্তি না পেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানযিলগুলো আরো বেশি কঠিন হবে। তিনি (উসমান) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ- আরো বলেছেন, 
আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ংকর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি।
--- [ ইবনু মা-জাহ : ৪২৬৭, তিরমিযী : ২৩০৮ ]
.

উমার ইবনুল খাত্তাব [ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ] বলেন, 
“যার হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম ---
যদি আমার কাছে দুনিয়ার সকল স্বর্ণ এবং রৌপ্য থাকতো, আমি সেগুলোর বিনিময়ে হলেও মৃত্যুর পরে যে ভয়াবহতা রয়েছে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম।”
---- [ সাহীহ আত-তাওতিক ফি সীরাত ওয়া
হায়াত আল-ফারুক : পৃ ৩৮৩ ]
.

এই দীর্ঘ যন্ত্রণাময় জীবনের অবসান ঘটবে শিংগার বিকট শব্দে। রূহসমূহ মৌমাছির মতো বের হয়ে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে দেবে। অত:পর রুহসমূহ দেহে প্রবেশ করবে। কিয়ামাত! অত:পর হিসাবের জন্য হাশরের মাঠে অপমান আর লাঞ্চনার অপেক্ষা। ভাববেন না যে এখানেই শেষ।
এবার মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন
করবেন। ছোট বড় কিছুই সেদিন বাদ যাবে না।
সেখানে মানুষের আমলনামা প্রকাশ করা হবে লিখিত
আকারে। এর পরপরই আপনাকে, আমাকে মুখোমুখি করা হবে পুলসিরাতের। পুলসিরাতের উপর দিয়ে আমাদের সকলকেই সেদিন অতিক্রম করতে হবে। নেককাররা বিদ্যুৎ, বাতাস ও দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে পার হয়ে যাবে। আবার কেউ পার হবে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে। অত:পর কেউ সামান্য আঁচাড় খেয়ে, কেউ আহত হয়ে,কেউ হুমড়ী খেয়ে পড়ে যাবে জাহান্নামে। এমনকি সর্বশেষ, ব্যক্তিকে টেনে টেনে জাহান্নামে নেয়া হবে।
.

চিন্তা করুনতো, সেদিন কি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে! তারপরও কি জাহান্নামের ঝুঁকি নিবেন ? তারপরও কি কিছুক্ষণ বা কিছুদিন জাহান্নামে থাকার মত দুঃসাহস দেখাবেন!?
প্রিয় ভাই আমার ! জাহান্নামে কিছুকাল থাকা তো দূরের কথা, কিছুক্ষণ থাকাও আমাদের পক্ষে সম্বব নয়। ঐ আগুনের লেলিহান উত্তাপ কলিজা হালাক করে দিবে । এখনো সময় আছে, দ্রুত আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসুন।
পরিশেষে দো'আ করি - আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদেরকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করুন যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। আমীন। 
.

সংকলক : 
আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী, 
আখতার বিন আমীর।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
কুরবানী সম্পর্কে ১২টি যঈফ হাদীস

কুরবানী সম্পর্কে ১২টি যঈফ হাদীস

কুরবানী সম্পর্কে ১২টি যঈফ হাদীস

লেখক: শাইখ আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
------------------------------------
কুরবানীর গুরুত্ব, ফযীলত এবং তৎ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীছগুলোর অবস্থা:

নিঃসন্দেহে কুরবানী একটি ইবাদত এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কারা যায়। এবং তাতে ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নাত আদায় করা হয়। সেই সাথে আমাদের প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নতও প্রতিপালিত হয়। কারণ, এ কুরবানী স্বয়ং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিয়েছেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 
من كان به سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا 
“কুরবানী দেয়ার সমর্থ থাকার পরও যে ব্যক্তি কুরবানী দেয় না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে।” (আহমাদ, ইবনু মাজাহ্)

তবে এটিকে অনেক মুহাদ্দিস মাওকুফ বা সাহাবীর উক্তি বলেছেন। অবশ্য মুহাদ্দিস আলবানী হাদীছটিকে মারফু তথা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী হিসাবে হাসান বলেছেন। (দ্রঃ ছহীহ ইবনু মাজাহ) হাফেজ ইবনু হাজার হাদীছটি সম্পর্কে বলেন, “কুরবানী করার ফযীলতে অনেকগুলি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর একটিও বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয়নি। বরং তার সবগুলোই যঈফ (দুর্বল) অথবা মউযূ (জাল)। মালিকী মাযহাবের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল আরাবী (রহঃ) বলেন:
ليس في فضل الأضحية حديث صحيح وقد روى الناس فيها عجائب لم تصح منها((إنها مطاياكم إلى الجنة)) -عارضة الأحوذي شرح جامع الترمذي (6/288)
“কুরবানীর ফযীলতে একটিও ছহীহ হাদীছ নেই। তবে মানুষ এ সম্পর্কে অনেক আজগুবী হাদীছ বর্ণনা করেছে যা মোটেও ছহীহ নয়। সে সব আজগুবী হাদীসের মধ্যে অন্যতম হল এই কথাটি:
(( إنها مطاياكم إلى الجنة))
“উহা তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন স্বরূপ”। (দ্রঃ তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ আরেযাতুল আহওয়াযী ৬/২৮৮)
-----------------------------------

🔰 নিম্নে কুরবানীর ফযীলত সংক্রান্ত হাদীছগুলো পর্যালোচনা সহ পরিবেশিত হল:
🛑 ১নং হাদীছঃ
عَنْ عَائِشَةَ ، أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : ” مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا ، أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هِرَاقَةِ دَمٍ ، وَإِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا ، وَأَظْلَافِهَا ، وَأَشْعَارِهَا ، وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ”
(أخرجه ابن ماجة برقم ৩১২৬ والترمذي برقم ১৪৯৩ والحاكم (৪/ ২২১-২২২ وانظر فقه الأضحية)

“আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, নবী বলেন, “কুরবানীর দিনে কোন আদম সন্তান কুরবানীর পশুর খুন ঝরানোর চেয়ে মহান আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আমল করে না। সে কিয়ামত দিবসে উক্ত পশুর শিং, খুর, লোম প্রভৃতি নিয়ে উপস্থিত হবে এবং তার খুন জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নির্ধারিত মর্যাদার স্থানে পতিত হয়। অতএব, তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানীকর।” (ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৬, তিরমিযী, হা/১৪৯৩, হাকেম৪ /২২১-২২২ দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ)
🌀 মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, হাদীছটির সনদে কয়েকটি দোষ আছে:
❒ ১) উক্ত হাদীছের সনদে আব্দুল্লাহ বিন নাফে নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তার স্মৃতি শক্তিতে দুর্বলতা ছিল।
❒ ২) হাদীসটির সনদে আবুল মুসান্না নামক আরেকজন রাবী রয়েছে তার আসল নাম হল সুলাইমান বিন ইয়াজিদ। তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও বাজে। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যা)
❒ ৩) উক্ত হাদীছের প্রায় অনুরূপ হাদীছ ইমাম আব্দুর বাযযাক তার মুছান্নাফ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। (হা/৮১৬৭) উক্ত হাদীসটির সনদেও আবু সাঈদ শামী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে তিনি একজন ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। (দ্রঃ প্রাগুক্ত)
--------------------------

🛑 ২নং হাদীছঃ
عن زيد بن أرقم قال قال أصحاب رسول الله: يارسول الله ماهذه الأضاحي؟ قال: سنة أبيكم إبراهيم قالوا: فما لنا فيها؟ قال: بكل شعرة حسنة، قالوا: فالصوف يارسول الله؟! قال بكل شعرة من الصوف حسنة
“যায়েদবিন আরকাম (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানীর পশুগুলির তাৎপর্য কি? (কেন আমরা এগুলো যবেহ করে থাকি?) তিনি বললেন: “ইহা তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ) এর সুন্নত।” তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, এতে আমাদের কী সওয়াব রয়েছে? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে।” তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, পশমের মধ্যে যে ছোট ছোট লোম রয়েছে ওগুলোরও কি বিনিময় তাই? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “ছোট ছোট প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে।” (ইবনু মাজাহ্, হা/৩১২৭, আহমাদ (৪/৩৬৮), ইবনু হিব্বান ফিল মাজরুহীন (৩/৫৫))
🌀 মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, এ হাদীসটির সনদে আবু দাউদ আল আম্মী নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তার প্রকৃত নাম হল, নুফাই ইবনুল হারিস। সে মুহাদ্দিসগণের নিকট ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। এতে আরও একজন রাবী রয়েছে তার নাম হল আয়েযুল্লাহ, সে ‘যঈফ’ রাবী।
🛑 ৩নং হাদীছঃ
عن أبي سعيد الخدري قال قال رسوالله صلى الله عليه وسلم لفاطمة عليها الصلاة والسلام!)) قومي إلى أضحيتك فاشهديها فإن لك بأول قطرة تقطر من دمها يغفر لك ماسلف من ذنوب((، قالت: يارسول الله! هذا لنا أهل البيت خاصة أو لنا وللمسلمين عامة؟ قال:))لنا وللمسلمين عامة(( ( رواه الحاكم ৪/২২২ والبزار ২/ ৫৯ مع كشف الأستار )
আবু সাঈদ খুদরী (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতেমা (রা:) কে বললেন, “(হে ফাতেমা!) তুমি তোমার কুরবানীর পশুর নিকট (যবেহ কালীন) দাঁড়াও এবং উপস্থিত থাক। কারণ তার প্রথম ফোটা খুন (জমিনে) পড়ার সাথে সাথে তোমার অতীতের গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে।” ফাতেমা (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি আমরা আহলুল বায়ত তথা নবী পরিবারের জন্যই খাস নাকি তা আমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য।” (হাকেম ৪/২২২) বাযযার ২/৫৯ কাশফুল আসতার)
🌀 মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। কারণ, এর সনদে আব্দুল হামীদ নামে একজন রাবী রয়েছে যে যঈফ। আরেকটি কারণ হল, এর সনদে আতিয়া আল আওফী নামে আরেকজন রাবী রয়েছে সেও যঈফ এবং মুদাল্লিস। আবু হাতিম তার ইলাল (علل) গ্রন্থে (হা/৩৮) বলেন, “এটি একটি ‘মুনকার’ হাদীছ।” (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ ১০)
-----------------------------------

🛑 ৪নং হাদীছঃ
عن علي رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لفاطمة: يا فاطمة فاشهدي أضحيتك أما إن لك بأول قطرة من دمها مغفرة لكل ذنب أما إنه يجاء بها يوم القيامة بلحومها ودمائها سبعين ضعفا حتى توضع في ميزانك
আলী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: “হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর নিকট জবেহ করার সময় উপস্থিত থাকিও। জেনে রেখ, ঐ পশুর রক্তের প্রথম ফোটা (মাটিতে) পড়ার সাথে সাথে তোমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। জেনে রেখ! কিয়ামত দিবসে কুরবানীর ঐ পশুগুলোকে রক্ত, মাংস সহ সত্তরগুণ বৃদ্ধি করে নিয়ে আসা হবে এবং তোমার দাঁড়িপাল্লায় তা রাখা হবে।” (বাইহাকী (৯/২৮৩) আবদুবনু হুমাইদ (৭/৮)
🌀 মন্তব্য: এ হাদীছের সনদে আমর বিন খালিদ ওয়াসেতী রয়েছে সে একজন ‘পরিত্যক্ত’ রাবী। অনুরূপ হাদীছ ইমাম আব্দুর রাযযাক যুহরী হতে ‘মুরসাল’ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসটির সনদে আব্দুল্লাহ বিন মুহাররার নামক একজন রাবী রয়েছে, তিনিও অত্যন্ত যঈফ। অনুরূপ হাদীছ ইমরান বিন হুসাইন হতে বায়হাকী (৯/২৮৩), হাকিম (৪/২২২) এবং তাবারানী (১৮/২৩৯) প্রমুখগণ তাদের স্ব স্ব কিতাবে বর্ণনা করেছেন)। উক্ত হাদিছটিকে ইমাম তায়ালিসী (মুসনাদ তায়ালিসী, হা/২৫৩০) ও ইবনু আদী (৭/২৪৯২) বর্ণনা করেছেন। তবে তার সনদেও দুজন যঈফ রাবী রয়েছে তারা হলেন, নাযর বিন ইসমাইল এবং আবু হামযাহ্ শেমালী। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহ্)
-----------------------------------

🛑 ৫ নং হাদীছঃ
عن على عن النبي صلى الله عليه وسلم : ))ياأيها الناس ضحوا واحتسبوا بدمائها وإن الدم وإن وقع في الأرض فإنه يقع في حرز الله عزو جل(( رواه الطيالسي برقم ৮৩১৫ ،والطبراني في الأوسط وفيه موسى بن زكريا وعمرو بن الحصين العقيلي وهما متروكان ، انظر: فقه الأضحية ومجمع الزوائد ৪/১৭)
আলী (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, (তিনি বলেন) “হে মানব মণ্ডলী! তোমরা কুরবানী কর এবং তার খুনকে সওয়াব লাভের মাধ্যম মনে কর। নিশ্চয়ই কুরবানীর পশুর খুন জমিনে পতিত হলে তা আল্লাহর হেফাজতে চলে যায়।” [আবু দাউদ তায়ালেসী (হা ৮৩১৫)।]
🌀 মন্তব্য: হাদীসটির সনদে মুসা বিন যাকারিযা এবং আমর ইবনুল হুসাইন রয়েছে। তারা উভয়ে ‘পরিত্যক্ত’ রাবী।
-----------------------------------

🛑 ৬ নং হাদীছ:
عن عبد الله ابن عباس رضى الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ماأنفقت الورق في شيئ أحب إلى الله من نحر ينحر يوم عيد (رواه الطبراني(১১/১৭) والدارقطني )৪/২৮২( والشجري في الأمالي )২/৭৯-৮০( وفي إسناده إبراهيم بن يزيد الخوزي وهو متروك ، انظر: فقه الأضحي)
“আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “চাঁদি (টাকা-পয়সা) যেসব ক্ষেত্রে খরচ করা হয় তার মধ্যে আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় হল কুরবানী যা ঈদের দিনে যবেহ করা (তাবারানী ১১/১৭) দারাকুতনী ৪/২৮২ প্রভৃতি।
🌀 মন্তব্য: উক্ত হাদীসটি যঈফ। কারণ হাদীসটির সনদে ইবরাহীম বিন ইয়াজিদ আল খোযী নামক একজন পরিত্যক্ত রাবী রয়েছে।
-----------------------------------

🛑 ৭নং হাদীছ:
عن الحسين بن علي قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((من ضحى طيبة بها نفسه محتسبا لأضحيته كانت له حجابا من النار ( رواه الطبراني ৩/ ৮৪، وفي إسناده : أبو داود النخعي (سليمان بن عمرو وهو كذاب
হুসাইন ইবনু আলী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কুরবানীর পশুকে খুশী মনে ও নেকীর আশায় যবেহ করবে তার এই কুরবানীর পশু জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পর্দা বা অন্তরায় হয়ে যাবে।”
🌀 মন্তব্য: এটি একটি মওযূ বা জাল হাদীস। এর সনদে আবু দাউদ নাখঈ (যার প্রকৃত নাম সুলাইমান বিন আমর) নামক একজন মহা মিথ্যুক রাবী রয়েছে।
-----------------------------------

🛑 ৮নং হাদীছঃ
عن عبدالله بن عباس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (( في يوم أضحى ))ماعمل ابن آدم في هذا اليوم أفضل من دم يهراق في سبيل الله إلا أن يكون رحما مقطوعة توصل(( (رواه الطبراني ১১)/ وفي إسناده الحسن بن يحى الخشني وهو صدوق كثير الغلط وفيه ليث ابن أبي سليم وإسماعيل بن عياش وكلاهما ضعيف، انظر: فقه الأضحية
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন বললেন, “কোন অদম সন্তান এই দিনে (কুরবানীর) খুন প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক সৎ আমল করে না। তবে ছিন্ন আত্মীয়তা সম্পর্ককে আবার অবিচ্ছিন্ন করার কথা ভিন্ন। (তাবারানী ১১/৩২)
🌀 মন্তব্য: হাদীছটি যঈফ। এর সনদে হাসান বিন ইয়াহয়া আল খোশানী নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। তিনি সত্যবাদী তবে প্রচুর ভুল করতেন। আরেকজন বর্ণনাকারী রয়েছে তার নাম লাইস বিন আবী সুলাইম তিনিও একজন যঈফ রাবী। এতে ইসমাইল বিন আয়্যাশ নামক অপর এক জন রাবী রয়েছে। তিনি যখন তিনি শামবাসী ছাড়া অন্য এলাকার মুহাদ্দিস গনের নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করবেন তখন তার হাদীস যঈফ বলে বিবেচিত হবে। আর এখানে তিনি শামবাসী ছাড়া অন্যদের থেকে হাদীসটি বর্ণনা করায় তা যঈফের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপ হাদীছ ইবনু আব্দুল বার তার ইস্তেযকার (৫/১৬৪) ও তামহীদ (২৩/১৯২) গ্রন্থে ইবনু আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করে সেটাকে ‘গারীব’ হাদীছ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটির সনদে সাঈদ বিন যায়দ নামক যঈফ বারী রয়েছে। তিনি ইমাম মালিক (রহঃ) হতে মুনকার বা অগ্রহণীয় অনেক কিছু বর্ণনা করতেন। (দ্রঃ ফিকহুল উযহিয়্যাহঃ ১১)
----------------------

🛑 ৯ নং হাদীছঃ
عن أبي هريرة عن النبي قال: استفرهوا ضحاياكم فإنها مطاياكم على الصراط – رواه الديلمي في مسند الفردوس )১/৮৫( وهوحديث ضعيف جدا ، انظر : فقه الأضحية )
আবু হুরাইরা (রা:) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তোমরা তোমাদের কুরবানীর পশুগুলো শক্তিশালী ও মোটা-তাজা দেখে নির্বাচন কর। কারণ এগুলো তোমাদের পুলসিরাতের উপর চড়ে যাওয়ার বাহন হবে।” (দাইলামী-মুসনাদুল ফিরদাউস ১/৮৫)
🌀 মন্তব্য: হাদীছটি অত্যন্ত যঈফ। হাফেয ইবনু হাজার তালখীছুল হাবীর গ্রন্থে (৪/১৩৮) বলেন: “হাদীছটি মুসনাদুল ফিরদাউস গ্রন্থের গ্রন্থকার ইবনুল মুবারক এর সূত্রে ইয়াহয়্যা বিন ওবায়দুল্লাহ্ বিন মাওহাব বর্ণনা করেছেন তার পিতা থেকে। তিনি আবু হোরায়রা হতে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন …..। তবে সনদে বর্ণিত ইয়াহয়্যা অত্যন্ত যঈফ। হাদীছটি ইমাম আলবানীও যঈফ বলেছেন। (দ্রঃ যঈফুল জামে হা/৯২৪)
-------------------------
🛑 ১০ নং হাদীছঃ

عن عبد الله بن عمرو بن العاص أن النبي قال: أمرت بيوم الأضحى عيدا جعله الله لهذه الأمة – قال الرجل: أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثى أفأضحي بها؟ قال: لا، ولكن تأخذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فتلك تمام أضحيتك عندالله ( أخرجه أبو داود برقم ২৭৮৮ وهو حديث ضعيف )
অর্থ: আমর ইবনুল ’আস হতে বর্ণিত। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আমি কুরবানীর দিনকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছি যা আল্লাহ এই উম্মতের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি বলল: আপনার কি মত এ ব্যাপারে-আমি যদি একমাত্র দান কৃত দুধাল বকরি ছাড়া আর কিছু না পাই তবে কি আমি ওটা জবাই (কুরবানী) করব? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “না (তা করবে না) বরং তুমি তোমার চুল, নখ, গোফ ও নাভির নিম্নদেশের লোম কাটবে। ইহাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণা ঙ্গ কুরবানী বলে গণ্য হবে।” (আবু দাউদ, কুরবানীর অধ্যায়, হা/২৭৮৮, নাসায়ী হাকেম (বৈরুত) ৪/২২৩ সনদ যঈফ। (দ্রঃ যঈফ আবু দাউদ হা/৫৯৫, যঈফ নাসায়ী হা/২৯৪।
🌀 মন্তব্য: হাদীছটিকে ইমাম হাকেমও উক্ত যঈফ সনদে বর্ণনা করেছেন।)
-------------------------------

🛑 ১১ নং হাদীছঃ
عن عائشة رضى الله عنها أيها الناس ضحوا وطيبوا بها أنفسا فإني سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: مامن عبد توجه بأضحيته ألى القبلة إلا كان دمها وقرنها وصوفها حسنات محضرات في ميزانه يوم القيامة، فإن الدم إن وقع في التراب فإنما يقع في حرز الله حتى يوفيه صاحبه يوم القيامة- ذكره أبو عمر بن عبد البر في كتاب التمهيد ، انظر: تفسير القرطبي )
আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “হে লোক সকল! আপনারা কুরবানী করুন এবং তা খুশী মনে করুন। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি যে, যদি কোন ব্যক্তি তার কুরবানীর পশু সহ কিবলা মুখী হয় (এবং যবেহ করে) তাহলে তার রক্ত, শিং এবং লোম নেকীতে পরিণত করে কিয়ামত দিবসে তার দাঁড়িপাল্লায় উপস্থিত করা হবে। কুরবানীর পশুর খুন যদিও তা মাটিতে পড়ে কিন্তু তা প্রকৃত অর্থে আল্লাহর হিফাজতে পড়ে। তিনিই এর প্রতিদান তাকে কিয়ামত দিবসে প্রদান করবেন। (কিতাবুত তামহীদ এর বরাতে তাফসীরুল কুরতুবী)
🌀 মন্তব্য: উক্ত হাদীছটির সনদও যঈফ।
-----------------------------------

🛑 ১২নং হাদীছঃ
عن ابن عباس رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:(( مامن نفقة بعد صلة الرحم أفضل عندالله من إهراق الدم (قال أبو عمر ابن عبد البر: وهو حديث غريب من حديث مالك، انظر: تفسير القرطبي))
ইবনু আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন: “আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি ছাড়া এমন কোন খরচ নেই যা আল্লাহর নিকট কুরবানীর পশুর খুন ঝরানোর চেয়ে উত্তম হতে পারে।” (তাফসীরুল কুরতুবী)।
আবু ওমার ইবনে আব্দুল বার বলেন: “এ হাদীসটি ইমাম মালেকের সূত্রে বর্ণিত একটি ‘গারীব’ হাদীছ” (দ্র: প্রাগুক্ত)।
🔰 নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা কুরবানীর ফযীলত প্রমাণিত হয়:
কুরবানীর ফযীলতে খাছ কোন ছহীহ বা হাসান হাদীছ না থাকলেও নিম্ন বর্ণিত হাদীছ দ্বারা পরোক্ষভাবে তার কিছু ফযীলত প্রমাণিত হয়। হাদীছটি হল:
عن ابن عباس رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((ما من أيام العمل الصالح فيها أحب إلى الله عز وجل من هذه الأيام يعني أيام العشر قالوا: ياررسول الله ولا الجهاد في سبيل الله ؟ قال: ولا الجهاد في سبيل الله إلا رجلا خرج بنفسه وماله ثم لم يرجع من ذلك بشيئ (رواه البخاري )
ইবনু আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুলাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন “যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিকতর প্রিয় কোন আমল নেই।” ছাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “জিহাদও নয়। তবে ঔ ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে নিজের জান ও মাল নিয়ে (জিহাদে) বেরিয়েছে এবং আর সে কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি (বুখারী)
অন্য হাদীছে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “আরাফার দিনের ছিয়াম পালন করলে (যারা হজ্জব্রত পালনকারী নয় তাদের জন্য) পূর্ববতী এবং পরবর্তী একবছরের গুনাহর কাফফারা হয়ে যায়।” (ছহীহ মুসলিম)
যেহেতু কুরবানী করা ১০ যিলহাজ্জের অন্যতম একটি করণীয় কাজেই সাধারণভাবে কুরবানীরও ফযীলত এ হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়।
আল্লাহু আলাম।
গ্রন্থ: কুরবানীর মাসায়েল 
ঋণে কুরবানি করার বিধান

ঋণে কুরবানি করার বিধান

ঋণে কুরবানি করার বিধান

▬▬▬▬✿✿✿▬▬▬▬▬

প্রশ্ন: কারো যদি ঋণ (মোটামুটি পরিমাণ) থাকে তাহলে তার উপর কুরবানি করা জরুরি না। এ কথা ঠিক?

উত্তর: যদি ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকে তবে কুরবানি দেয়া ভালো। অর্থাৎ বর্তমানে হাতে টাকাপয়সা না থাকলেও তার কাছে এমন কিছু সম্পদ আছে যা দ্বারা ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব তাহলে সাময়িকভাবে কারো নিকট ঋণ নিয়ে কুরবানি করতে কোনো আপত্তি নাই।

অনুরূপভাবে কেউ যদি এককালীন বা কিস্তিতে কুরবানির দাম পরিশোধ করার শর্তে বাকিতে কুরবানি ক্রয় করা হয় তাহলে তাতেও কোনো আপত্তি নাই-যদি ঋণ পরিশোধ করার মত অন্যান্য সম্পদ তার মালিকানায় থাকে।

উল্লেখ্য যে, কুরবানির বিধান হল, অধিকাংশ আলেমের মতে তা সুন্নতে মুআক্কাদা। মতান্তরে ওয়াজিব।

💠 ঋণে কুরবানি করার ব্যাপারে আলেমদের মতামত পেশ করা হল:

 শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ কে জিজ্ঞেস করা হল, যে ব্যক্তির কুরবানি করার ক্ষমতা নেই সে কি (কুরবানির করার জন্য)
ঋণ নিতে পারে?
উত্তরে তিনি বলেন:
" إن كان له وفاء فاستدان ما يضحي به فحسن ، ولا يجب عليه أن يفعل ذلك " انتهى 
"مجموع الفتاوى" (26/305) .
“যদি ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা থাকে তাহলে কুরবানি করার সমপরিমাণ ঋণ নেয়া ভালো। কিন্তু এমনটি করা তার জন্য ওয়াজিব নয়।” (মাজমু ফাতাওয়া ২৬/৩০৫)
 শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহঃ কে জিজ্ঞেস করা হল, যার কুরবানি দেয়ার ক্ষমতা নেই তার জন্য কি কুরবানি দেয়া ওয়াজিব? আর বেতন এর উপর ঋণে কুরবানি নেয়া কি জায়েজ আছে?
তিনি বলেন:
" الأضحية سنة وليست واجبة . . . ولا حرج أن يستدين المسلم ليضحي إذا كان عنده القدرة على الوفاء " انتهى "فتاوى ابن باز" (1/37) 
কুরবানি করা সুন্নত; ওয়াজিব নয়। আর ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা থাকলে মুসলিম ব্যক্তি ঋণ নিয়ে কুরবানি করলে তাতে কোনো আপত্তি নেই। (ফাতাওয়া বিন বায ১/৩৭)

 আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ আল উসাইমীনকে জিজ্ঞেস করা হল:
দরিদ্র ব্যক্তির জন্য কি ঋণ করে কুরবানি করা শরিয়ত সম্মত?

উত্তরে তিনি বলেন:
ঈদুল আযহা আগমনের সময় কোনো দরিদ্র ব্যক্তির হাতে যদি টাকাপয়সা না থাকে কিন্তু আশা করে যে, সে তা সংগ্রহ করতে পারবে। যেমন: তার মাসিক বেতন আছে। অথবা ঈদের দিন তার হাতে কিছু নাই কিন্তু তার কোনো সাথী-বন্ধুর নিকট ঋণ নিতে পারবে। পরে বেতন পেলে পরিশোধ করে দিবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, তুমি ঋণ নিয়ে কুরবানি করবে। আর পরে তা পরিশোধ করে দিবে। কিন্তু যদি জলদি ঋণ পরিশোধ করার আশা না থাকে তাহলে আমরা বলি না যে, কুরবানি করার জন্য ঋণ নেয়া উত্তম। কেননা এ ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে তার মাথায় ঋণের চাপ পড়ে গেলো এবং সে মানুষের দয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে গলো। আর সে জানে না যে, ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না। (মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ২৫/১১০)
▬▬▬▬✿✿✿▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: 
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব
আরাফার দিনের ফযিলতগুলো কি কি?

আরাফার দিনের ফযিলতগুলো কি কি?

 আরাফার দিনের ফযিলতগুলো কি কি?

উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ।
আরাফার দিনের ফযিলতের মধ্যে রয়েছে:

১. দ্বীন ও আল্লাহর নেয়ামত পরিপূর্ণ হওয়ার দিন:
সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ইহুদী লোক তাঁকে বলল: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে এমন একটি আয়াত রয়েছে যদি আমরা ইহুদীদের উপর এ আয়াতটি নাযিল হত তাহলে আমরা সে দিনটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম। তিনি বললেন: কোন আয়াতটি? সে বলল: الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا [المائدة: 3] (অর্থ- আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।)[সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩] উমর (রাঃ) বলেন: যে দিন ও যে স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে সেই দিন ও সেই স্থানটি আমরা জানি: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমাবার আরাফার ময়দানে দণ্ডায়মান অবস্থায় ছিলেন।
২. আরাফার মাঠে অবস্থানকারীদের জন্য এটি ঈদের দিন:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আরাফার দিন, কোরবানীর দিন ও তাশরিকের দিনগুলো আমরা মুসলমানদের জন্য ঈদ বা উৎসবের দিন। এ দিনগুলো পানাহারের দিন।”[হাদিসটি সুনান গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে] উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ শীর্ষক আয়াতটি নাযিল হয়েছে জুমার দিন, আরাফার দিন। আলহামদু লিল্লাহ উভয় দিন আমাদেরর জন্য ঈদ।
৩. এটি এমন একটি দিন যেই দিনকে দিয়ে আল্লাহ তাআলা কসম করেছেন:
মহান সত্তা মহানকে দিয়ে কসম করে থাকেন। এটি এমন দিন আল্লাহর বাণী: “আর প্রতিশ্রুতি দ্রষ্টা ও দৃষ্টের”[সূরা বুরুজ, আয়াত: ৩] এর মধ্যে যেদিনকে বলা হয়েছে- দৃষ্ট। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “প্রতিশ্রুত দিন হচ্ছে- কিয়ামতের দিন। আর দৃষ্ট দিন হচ্ছে- আরাফার দিন। আর দ্রষ্টা হচ্ছে- জুমার দিন।”[সুনানে তিরমিযি; আলবানী হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন]
এটি হচ্ছে সে বেজোড় যা দিয়ে আল্লাহ তাআলা কসম করেছেন তাঁর বাণী: “শপথ জোড় ও বেজোড়ের” [সূরা আল-ফজর; আয়াত: ৩] আয়াতের মধ্যে। ইবনে আব্বাস বলেন: “জোড় হচ্ছে- ঈদুল আযহার দিন। আর বেজোড় হচ্ছে আরাফার দিন।” ইকরিমা ও দাহ্হাকও এ কথা বলেন।

৪. এই দিন রোযা রাখলে দুই বছরের পাপ মোচন হয়:
আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “এটি বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের পাপ মোচন করে।”[সহিহ মুসলিম]
যারা হাজী নন তাদের জন্য এ রোযা রাখা সুন্নত। যারা হাজী তাদের জন্য আরাফার দিন রোযা থাকা সুন্নত নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন রোযা রাখেননি। তাঁর থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি আরাফার ময়দানে আরাফার দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন।

৫. এটি এমন দিন যেদিন আল্লাহ তাআলা বনী আদম থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন:
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহ নামানে -অর্থাৎ আরাফার ময়দানে- আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। তিনি আদমের মেরুদণ্ডে তাঁর যত বংশধরদের রেখেছেন তাদের সবাইকে বের করে এনে অণুর মত তাঁর সামনে ছড়িয়ে দেন। এরপর সরাসরি তাদের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন: আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা সকলে বলে: হ্যাঁ অবশ্যই; আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। এটা এ জন্যে যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম। কিংবা তোমরা যেন না বল, আমাদের পিতৃপুরুষরাও তো আমাদের আগে শির্ক করেছে, আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর; তবে কি (শির্কের মাধ্যমে) যারা তাদের আমলকে বাতিল করেছে তাদের কৃতকর্মের জন্য আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন।”[সূরা আরাফ, আয়াত: ১৭২-১৭৩] হাদিসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। অতএব, কতই না মহান সেই দিন এবং কতইনা মহান সে প্রতিশ্রুতি।
৬. এটি গুনাহ মাফের দিন, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির দিন, আরাফাবাসীদের নিয়ে গৌরব করার দিন:
সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, “আরাফার দিনের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই যেই দিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন; নিশ্চয় তিনি নিকটবর্তী হন; অতঃপর তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলেন: এরা কি চায়?”
ইবনে উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ আরাফাবাসীদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলেন: আমার বান্দাদের দিকে তাকাও; তারা এলোমেলো চুল ও ধুলোমলিন হয়ে আমার কাছে এসেছে।”[মুসনাদে আহমাদ; আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
আল্লাহই ভাল জানেন
___________________________

কার্টেসি:-- islamqa.info
প্রিয় হবু শ্বশুরআব্বা,

আপনি নিশ্চয় ই জানেন, আমি একজন প্রবাসী এবং মধ্যবৃত্ত ঘরের সন্তান!"বিয়ে "করার জন্য শারিরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকলেও আর্থিক দিক কিছুটা দূর্বল!
তাই বলে একথা ভাববেন না যে, আপনার মেয়ের শাড়ি, চুড়ি সাবান, লিপিস্টিক কেনার সামর্থ্য আমার নাই!
বিলাসীতা না করতে পারলেও আপনার কিউট মাইয়াডা একটা স্বচ্ছ আয়নার মত "মন" পাবে সে নিশ্চয়তা দিতে পারি! 
যেহেতু আমার বয়স টা আপনিও পার করে এসেছেন,
তাই যুবকদের বয়সকেন্দ্রিক চাহিদাগুলো আপনার অজানা থাকার কথা নয়! 
স্ত্রী আপনারও আছে, আবার স্ত্রী ছাড়া একটা লম্বা সময় আপনিও পার করে এসেছেন সুতরাং আমার সমস্যা গুলো আপনার চাইতে কে ই বা ভাল বুঝবে(!)
তাই লোক লজ্জার মাথা খেয়ে আপনার উদ্দেশ্যে 
এই খোলা চিঠিখানা লিখতে বাধ্য হুলাম.....

প্রিয় হবু শ্বশুরআব্বা,
আপনার কাছে অনুরোধ দেনমোহর আমার সাধ্যের মধ্যেই ধার্য করবেন! লোক দেখানো কোন দেনমোহর ধার্য করবেন না, যা পূরণ করতে আমার আন্ডারওয়ার পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়! আমি আপনার মেয়েকে
"বউ" হিসেবে চাচ্ছি কিন্তু তাই বলে ফকির হতে চাচ্ছি না। কারন, দেনমোহর আল্লাহ্‌তালা চাইলে বিয়ের রাতেই পরিশোধ করে দিবো। আপনি আমার হবু শাশুড়ির সাথে দূর্নীতি করলেও আমি আপনার মেয়ের সাথে অন্তত এই টাইপের কিছু করতে চাচ্ছিনা!
"ওগো আমার ময়না পাখী, দেনমোহরের অর্থ ক্ষমা করে দাও " এ জাতীয় কিছু বলার কোন ইচ্ছে আমার নাই!
ঠিক আছে আংকেল ? 
ও থুক্কু (!) ঠিক আছে শশুর [হবু] ?

প্রিয় হবু শ্বশুরআব্বা,
বিয়েতে কোন ধরনের আয়োজন করতে পারবো না! নিজের টাকা খরচ করে ভ্যাড়ার পাল দাওয়াত করে খাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব না! সাধারন সামাজিকতা রক্ষার্থে যাদের- যাদের বলা প্রয়োজন, তাদের অবশ্যই ডাকবো। এছাড়া, গায়ে হলুদ, বউ ভাত ইত্যাদি আজাইরা কোন আয়োজন করতে পারবো না।
যেহেতু আমি মধ্যবৃত্ত ঘরের সন্তান তাই ৫/৭ ভরি স্বর্ণ দেওয়া আমার পক্ষে সম্বব নয়! হয়তো ২/৩ ভরিও দেয়ার সামর্থ্য আমার নাই তারপরেও চেষ্টা করব যতটুকু দেওয়া যায়! তাই , এই রকম কোন আশা বা শর্ত রাখতে পারবেন না। আপনি চাইলে আপনার মেয়েকে গহনা ছাড়াই আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন, আমার কোন আপত্তি নাই। জীবন যাপন আপনার মেয়ের সাথে করবো, স্বর্ণের সাথে নয়! তাই, আমার সাধ্যে থাকলে দিমু নইলে না, আর আপনার কাছেও চাচ্ছি না।
প্রিয় হবু শ্বশুরআব্বা,
আমার নামে কোন ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ নাই। এর মানে আমার কাছে কোন টাকা নাই। আমার সকল কিছু বর্তমানে আমার মা/বাবার কাছে। আশা করি ছেলের অর্থ সম্পদ কি আছে সেটা যাচাই করতে যাবেন না। "ছেলেরা স্বর্ণের আংটি "সেটা বাকা হলেও মুল্যবান এই সুত্র খানা মাথায় রাখলেই হবে।
আগেই বলে রাখি, আপনার মেয়ে কোন ধরনের চাকরী করার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে না। পূর্বে থেকেই যদি চাকরী করে, তবে তাকে সেটাও ছাড়তে হবে। 
যদি পর্দা লংগিত না হয় এবং আমি যদি সেটা তার জন্য উপযুক্ত মনে করি সেক্ষেত্রে টুকটাক শিক্ষকতা, চিকিৎসক বা কোন জনসেবা মূলক কাজ হলে সেটা বিবেচনাধীন থাকবে।!
তবে, "আমি টাহা [টাকা] কামাই করি" এই ভাবের ঠেলায় যদি পরিবারে কোন রকম ভ্যাজাল করে, যা পরিবারের ঐক্য, সুখ-শান্তি বিনষ্ট হয়, তবে আমি শরিয়াহ সম্মত পন্থায় তাকে পুনরায় আপনার বাড়িয়ে পাঠিয়ে দিবো!

মেয়েকে অবশ্যই পর্দা করে চলতে হবে! এই পর্দা কোন জানালার পর্দা না, যা আজ কাল'কার মেয়েরা করে থাকে! এমন পোশাক পড়তে হবে, যেটাকে শরিয়তে পর্দা বলে।
মেয়েকে নিয়মিত নামাজ পড়তে হবে এবং সাধ্যের মধ্যে সকল ইবাদত 'যা আল্লাহ্‌তালা হুকুম করছেন সেই গুলো পালন করতে হবে। এইটা যেন আমাকে বলে,বলে পড়াতে বা করাতে না হয়। বিয়ের আগেই মেয়ের মাথায় এইটা ঢুকাইয়া দিয়েন! নইলে বিয়ের পরে এই সব নিয়ে টালবাহনা করলে বা তর্ক করলে আমি শরিয়ত সম্মত পন্থায় সিদ্ধান্ত নিব। এক ই সিদ্বান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার মেয়েরও রয়েছে!

রাগ উঠলে যেন কোনরকম গালাগালি না করে! আমিও গ্যারান্টি দিতেছি, কোনদিন তাকে গালি বা বাজেকথা এবং মারধর জাতীয় কিছু করবো না। এই গুলা আমার লিস্টে কোন দিন ছিলই না, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও হবে না। কারন, আমি জানি, পরের মেয়েকে বিয়ে করে আনছি মারধর করার জন্য নয়, ঘর করার জন্য, আমার আবেগ শেয়ার করার জন্য। 
নিশ্চয়ই একই উদ্দেশ্যে আপনিও আমার হবু শ্বাশুড়িকে বিবাহ করেছিলেন!

প্রিয় হবু শ্বশুরআব্বা,
আপনার কিউট মাইডারে অবশ্যই, অবশ্যই রান্না জানতে হবে। রান্না না জানলে সমসা নেই।আমি শিখিয়ে দিবো।।। আপনার মেয়ের যদি রান্না করা অসুবিধা মনে করে শিখতেও না চায় তাহলে, যেদিন আপনার বাড়িতে প্রস্তাব দিবো, সেদিনই আমার প্রস্তাব নাকচ করে দিবেন প্লিজ। আমার বাড়িতে কোন চাকরানি নাই, যে আপনার মেয়েকে রান্না করে খাওয়াবে!
আমার মা দিন দিন বৃদ্ধ হচ্ছে। তাই যতটা সম্ভব তার সেবা করতে হবে আপনার মেয়েকেই, যদিও এটা তার জন্য ফরজ নয় তবে এটা আমার অবদার কেননা আমার কোন বোন নেই এবং আমিই আমার মায়ের বড় সন্তান!
বৃদ্ধ মানুষ একটু ভুল বেশী করে, কারন এই সময় তাদের মস্তিস্ক দুর্বল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কোনরকম রাগ, ক্ষোভ না দেখিয়ে ধৈর্য ধরে তার ভুল এড়িয়ে তার সেবা করতে হবে। আমার বাড়ি তে আপনার মেয়ের কাজ হল- রান্না করবে, ঘর বাড়ি গুছাইয়া রাখবে, খাইবে, ঘুমাইবে, আমার মায়ের সেবা করবো ইত্যাদি। এছাড়া আমার বাড়িতে আপনার মেয়ের আর কোন কাজ নাই।
প্রিয় আংকেল! থুক্ক স্বশুরআব্বা!
আমার উপরোক্ত কথাগুলোকে আপনি বিয়ের পূর্বশর্ত 
অথবা চাহিদা হিসেবে নিতে পারেন!
আপনি সামাজদার মানুষ! নিশ্চয় ই জানেন- দুনিয়ার জমিনে আল্লাহ্‌তালা এমন কোন সুন্দর ফুল আজও ফোটায়নি, যা নারীর চেয়ে সুন্দর! সুতরাং 
কক্সবাজারে "হানিমুন" করে আসা হবু শ্বশুরগণ
আমার ফিলিংসটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়!

ইতি,
আপনার হবু জামাতা!
,,,,,কপি পোষ্ট,,,,,
মুসলমানদের চলমান দুরাবস্থা ও আমাদের গাফালত!

মুসলমানদের চলমান দুরাবস্থা ও আমাদের গাফালত!

মুসলমানদের চলমান দুরাবস্থা ও আমাদের গাফালত! 
.


মুসলমানদের চলমান দুরাবস্থার দিকে তাকালে অন্য দশজনের মত শোকে-হতাশায় আমাদের অন্তরটাও পাথর হয়ে যায়! সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, বার্মা কিংবা কাশ্মীরের লক্ষ মুসলিমের যুলম -নির্যাতন, পৈশাচিক নৃশংসতা, মানবতাবাদীদের কুৎসিত প্রদর্শনী স্বচক্ষে দেখার পর যার ভেতরে সামান্যতম বিবেকবোধ রয়েছে , তার পক্ষেও স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয়।
.

আজকে মুসলিম উম্মাহ ডানা ভাঙ্গার পাখির মত অসহায়, আমাদের উপর কাফিররা কেন এত চড়াও হচ্ছে সেব্যাপারে আমরা ভ্রুক্ষেপহীন। কার্যত আমরা এই দুনিয়াতে শরনার্থী হয়ে বেঁচে আছি। আর শরনার্থীই বা হবোনা কেন!? চিন্তা করুনতো - অধিকাংশ যুবক-যুবতীই কোনো না কোনোভাবে নেশাগ্রস্থ! নাচ-গান, খেল-তামাশা, ক্রিকেট -ফুটবল, যেনা - ব্যাবিচার, মদ-জুয়া, বেনামাযী - বেদ্বীন, সুদ - ঘুষ, শিরিক-কুফরসহ এমন কোনো পাপ নেই যা আমাদের দ্বারা হচ্ছেনা!
.

আমরা দাবীতে মুসলিম, রাইট !? তাহলে বলুনতো, আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালবাসা কতটুকু? তাঁর দ্বীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা কতটুকু? প্রাণাধিক প্রিয়নবী মুহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ ﷺ- কতো কষ্ট করে এই ইসলাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন, আমাদের জন্য কেঁদেছেন , সেইদিনও কাঁদবেন যেদিন আমাদের বিচার কায়েম হবে, সেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমাদের ভালবাসা কতটুকু ? তাঁর আদর্শ আমরা কতটুকু অনুসরণ করছি!? বলুন কতটুকু? ঐ শুনুন মহান আল্লাহর বাণী - “নিশ্চয়ই আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের ভিতরের অবস্থা পরিবর্তন করে।”
--- [ সুরাহ আর রাদ, আয়াত : ১১ ]
.

হে প্রিয় ভাই! বিশ্বাস করুন, আমরা যখনই আল্লাহর প্রদত্ত দ্বীন থেকে সরে গিয়ে তার নাফরমানীতে লিপ্ত হয়েছি, ঠিক তখনই মহান আল্লাহ আমাদেরকে লাঞ্ছিত, অপমানিত করেছেন। অত:পর কাফিরদের "গোলামীর মালা" গলায় লাগিয়ে দিয়েছেন। একারণেই মুসলিমদের উপর বৃষ্টির মতো একের পর এক ফিতনাহ বর্ষিত হচ্ছে দেখে এখন আর আগের মত আশ্চর্য হইনা।
.

প্রাণাধিক প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি মহামুল্যবান উপদেশ দিয়েই নিবন্ধের ইতি টানছি!
একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ- আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু-আনহুকে ডেকে বলেন : হে আব্দুল্লাহ! আমি কি তোমাকে এমন কিছু কথা শিক্ষা দেব না,
যার মাধ্যমে তুমি উপকৃত হবে!?
আব্দুল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল!’
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ- বললেন ─

"হে বৎস, তুমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার (বিধি-নিষেধ) রক্ষা করবে, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি তাঁর (আল্লাহর বিধি-বিধানের) প্রতি লক্ষ রাখবে, তাহলে তাকে কাছে পাবে। সুখের সময় আল্লাহকে চেনো, তিনি দুঃখের সময় তোমাকে চিনবেন। যদি কোনো কিছু চাইতে হয়, তবে আল্লাহর কাছে চাও। আর যদি সাহায্য প্রার্থনা করতে হয় তবে আল্লাহর কাছেই করো।

ঘটিতব্য বিষয়ে কলম শুকিয়ে গেছে। যদি লোকেরা চেষ্টা করে তোমাকে এমন বিষয়ে উপকৃত করতে, যা আল্লাহ তোমার জন্য লিপিবদ্ধ করেননি, তবে তারা কখনোই তা পারবে না। আর যদি লোকেরা তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চেষ্টা করে, যা আল্লাহ তোমার ভাগ্যে লিখে রাখেননি, তাহলেও তারা তা কখনোই করতে পারবে না। যদি সততার সাথে সুদৃঢ়ভাবে আল্লাহর জন্য আমল করতে সক্ষম হও তবে তা করো। আর যদি সক্ষম না হও তবে যে বিষয়টি তোমার কষ্টকর লাগছে সে বিষয়ে (তোমার জন্য) প্রভূত কল্যাণ রয়েছে। জেনে রাখো, সবরের সাথেই রয়েছে (আল্লাহ-প্রদত্ত) সাহায্য। বিপদের সাথেই রয়েছে বিপদমুক্তি। দুঃখের পরেই রয়েছে সুখ।"
---- [ মুস্তাদরাক্ব হাকেম : ৫/৫৪১ ]
.

আমাদের সকলেরই একথা জেনে রাখা আবশ্যক যে, উপরিউক্ত ফিতনাহ থেকে মুক্তির কোন পথ নেই, একমাত্র আল্লাহর কিতাব তথা ক্বুরআনুল কারীম ও
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে আসা ছাড়া।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদেরকে খাঁটি মুসলিম হয়ে, কাফিরদের উপর বিজয়ী হওয়ার তাউফীক্ব দান করুন, আমীন।

.

সংকলক :
আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী,
আখতার বিন আমীর।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
কুরবানি সংক্রান্ত প্রচলিত ১৭টি ভুল

কুরবানি সংক্রান্ত প্রচলিত ১৭টি ভুল

লেখক: আব্দুর রাকীব মাদানী
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬


আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বাদঃ

অতঃপর এই সংক্ষিপ্ত লেখায় আমরা কুরবানি সংক্রান্ত কতিপয় ভুল-ত্রুটি আলোকপাত করার ইচ্ছা করেছি, যেন এই ইবাদতটি আমরা সঠিক ভাবে সম্পাদন করতে পারি এবং ভুল-ত্রুটি থেকে দূরে থেকে পূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হতে পারি। ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।
◈ ১-কুরবানির উদ্দেশ্যে ভুল:
কুরবানি একটি ইবাদত কারণ মহান আল্লাহ তা পছন্দ করেন এবং আমাদের তা করার আদেশ দেন। আল্লাহ বলেন: (তাই তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে স্বলাত পড় এবং কুরবানি কর।) [সূরা কাউসার/২] এই রকম প্রত্যেক ইবাদত কবুলের প্রথম শর্ত হল, ইবাদতে ইখলাস থাকা। অর্থাৎ ইবাদতটি খাঁটি ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হওয়া। তাই কুরবানি করার উদ্দেশ্য হবে শরীয়া নির্দিষ্ট পশু নির্দিষ্ট সময়ে জবাই করার মাধ্যমে আল্লাহকে রাযী-খুশী করা। কিন্তু তিক্ত সত্য হচ্ছে সমাজের বহু লোক কুরবানি দেয় গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে, যা তাদের কথা-বার্তায় অনেক সময় প্রকাশও পায়। তারা বলে: কুরবানি না দিলে গ্রাম-সমাজের লোকেরা কি বলবে! সেদিন সবাই গোশত খাবে আর আমার বাচ্চা-কাচ্চারা কি খাবে! আর অনেকে দেয় সমাজে প্রসিদ্ধ হবার উদ্দেশ্যে ও নাম পাবার আশায়। তাই বাজারের সেরা পশু ক্রয় করে পত্র-পত্রিকায় প্রচার করে বা প্রচারের আশা করে। অথচ আল্লাহ বলেন:
لَنْ يَنَالَ اللَّـهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَـٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
অর্থ: “আল্লাহর কাছে ঐসবের গোশত এবং রক্ত পৌঁছে না বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভীরুতা)।” [আল হজ্জ/৩৭]
◈ ২-অনেক সামর্থবান ব্যক্তি কুরবানি তো করে কিন্তু ফরয ইবাদত হজ্জকে বেমালুম ভুলে যায়:
যিল হজ্জ মাসের ১০ম তারিখ যেদিন কুরবানির দিন সেদিন কিন্তু হজ্জেরও বিশেষ দিন। প্রত্যেক সামর্থবান মুসলিমের প্রতি হজ্জ করা ফরয। কিন্তু এমন অনেকে আছে যারা প্রতি বছর কুরবানি তো ধুমধামের সাথে করে থাকে কিন্তু তাদের উপর হজ্জ করা যে জরুরি তা বেমালুম ভুলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহর জন্য উক্ত ঘরের হজ্জ করা লোকদের উপর আবশ্যক যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, (সে জেনে রাখুক) নিঃসন্দেহে আল্লাহ জগত সমূহের প্রতি অমুখাপেক্ষী।”[আল ইমরান/৯৭]
◈ ৩-যিল হজ্জ তথা কুরবানির মাসের প্রথম দশকের বিভিন্ন ফযিলত উপেক্ষা করে শুধু কুরবানি করতে আগ্রহী হওয়া:
উল্লেখ্য যে, যিল হজ্জ মাসের ১ম দশক খুবই ফযীলতপূর্ণ দশক। অনেক উলামার মতে, আল্লাহর নিকট যিল হজ্জ মাসের প্রথম দশকের দিনের সৎ আমল সমূহ রমাযানের শেষ দশকের দিনের ইবাদতের থেকেও উত্তম। [শারহুল্ মুমতি, ইবনু উসাইমীন,৬/৪৭০] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “কোনো এমন দিন নেই, যাতে এই দশকের তুলনায় সৎ আমল আল্লাহর নিকট বেশী পছন্দনীয়। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহর রসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি বেশী পছন্দনীয় নয়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও বেশী পছন্দনীয় নয় কিন্তু সেই ব্যক্তি যে তার জান ও মাল নিয়ে বের হয় এবং তা নিয়ে আর পুনরায় ফেরত আসে না”। [বুখারী, দুই ঈদ অধ্যায়, নং (৯৬৯)/আবু দাঊদ নং (২৪৩৮)]
উপরোক্ত হাদিসের মর্মার্থ ব্যাপক, তাই সকল ধরণের সৎ আমল এই দশকে বেশী বেশী করণীয়। যেমন,
হজ্জ ও উমরাহ। কারণ এটি হজ্জের মাস এবং উক্ত আমল দুটির ফযিলত ও অপরিসীম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “এক উমরা আর এক উমরার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফ্ফারা স্বরূপ। আর (মাবরূর) গৃহীত হজ্জের বদলা জান্নাত ছাড়া কিছু নয়”। [বুখারী, নং ১৭৭৩ মুসলিম নং ১৩৪৯]
সিয়াম পালন। যেহেতু হাদিসে সৎ আমল কথাটি ব্যাপক আর রোযা হচ্ছে সৎ আমল, তাই অনেকে এই দশকের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত রোযা পালন উত্তম মনে করেছেন।[শারহু মুসলিম, নবভী, ৮/৭৫] বিশেষ করে আরাফার দিনে। কারণ আরাফার দিনের রোযা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা স্বরূপ। [মুসলিম, নং ১১৬২]
এই দশকে তাকবীর পাঠ করা। [বিস্তারিত এই পয়েন্টের পরে]
কুরবানি করা।
দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর-আযকার, সদকা, আত্মীয়তা বজায় রাখা ইত্যদি।
কিন্তু আমদের অনেকেই উপরোক্ত আমল সমূহের প্রতি তেমন গুরুত্ব না দিয়ে কেবল কুরবানি করার জন্য, পশু ক্রয় করা ও তা কুরবানি দেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকি!

◈ ৪-এই পুরো দশকে সাধারণত: এবং তাশরীকের দিন গুলিতে ফরয নামাযান্তে বিশেষ করে তাকবীর পড়ার সুন্নতকে অবহেলা করা:
এই দিনগুলি হচ্ছে বিশেষ করে আল্লাহকে স্মরণ করার দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তাই এতে বেশী বেশী তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) এবং তাহমীদ (আল্ হামদুলিল্লাহ) পাঠ কর”। [আহমদ, নং ৬১৫৪, আহমদ শাকির সহীহ বলেছেন] অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “এগুলি পানাহার এবং আল্লাহর যিকরের দিন”। [আবু দাঊদ (২৪১৯, নাসাঈ ৩৯৯৫)
এই ১৩ দিনে দুই ধরণের তাকবীর পাঠ সুন্নাহ:
একটি হলঃ সাধারণ তাকবীর পাঠ, যা ১ম যিল হজ্জ থেকে ১৩ই যিল হজ্জের সূর্য ডোবা পর্যন্ত যে কোনো সময় পাঠ করা সুন্নাহ। আর একটি হল মুক্বায়্যাদ (শর্তযুক্ত) তাকবীর পাঠ। আর তা হচ্ছে, প্রত্যেক ফরয নামাযান্তে তাকবীর পাঠ যা, আরাফার দিন ফজর নামাযের পর থেকে শুরু হয়ে ১৩ই যুল হজ্জের আসর নামায পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। (এটা তাদের জন্য যারা হজ্জ পালনকারী নয়) আর হাজীদের ক্ষেত্রে এই মুক্বায়্যাদ তাকবীর কুরবানির দিন যোহর থেকে শুরু হবে এবং তাশরীকের শেষ দিন আসর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। [মাজমুউ ফাতাওয়া,২৪/২৫৩, মুলাখ্খাস আল ফিকহী, ১৩২-১৩৩]
একাধিক সাহাবা থেকে এই তাকবীরের শব্দগুলি প্রমাণিত, তন্মধ্যেঃ
◉ ক-আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার কাবীরা। [বায়হাক্বী,৩/৩১৬, ফাতহুল বারী, ২/৪৬২]
◉ খ-আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ। [মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা (৫৬৩৩)]
◉ গ- আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল্লাহু আকবার ওয়া আজাল্ল, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। [মুসান্নাফ নং (৫৬৪৬)]
এই দশকে ইবনু উমার ও আবু হুরাইরা (রাযিঃ) বাজারে বের হতেন, তারা তাকবীর দিতেন এবং অন্য লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীর পড়তেন। [বুখারী, ঈদাইন অধ্যায়, তা’লীকান]

আজ আমাদের সমাজে এই সুন্নাহ মৃতপ্রায়। আমাদের এই সুন্নাহ পুনর্জীবিত করার সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।
◈ ৫-যে ব্যক্তি কুরবানী করার নিয়ত করেছে এবং যিল হজ্জ মাসের চাঁদ দেখা দিয়েছে এমন ব্যক্তির কুরবানী না করা পর্যন্ত চুল, চামড়া ও নোখ কাটা থেকে বিরত না থাকা:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“যখন (যিল হজ্জ মাসের) দশক শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল, চামড়া ও নোখের কোনো কিছু না কাটে”। [মুসলিম, আযাহী অধ্যায়, নং ১৯৭৭]
তাই যে ভাই কুরবানী করতে চায়, সে যেন উপরে বর্ণিত কোনো কিছু না কাটে। কিন্তু যে নিজে কুরবানীদাতা নয় বরং তার পক্ষ থেকে বাড়ির গার্জিয়ান দেয়, যেমন ধরুন পরিবারের সদস্যরা তাহলে তারাও কি উপরের আদেশের অন্তর্ভুক্ত? শাইখ ইবনে উসায়মীন (রাহেঃ) মনে করেনঃ উপরোক্ত নিষেধাজ্ঞা কেবল তার জন্য যে স্বয়ং কুরবানী দাতা আর যাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় তাদের উপর সে সব কর্তন করা অবৈধ নয়। তিনি মনে করেনঃ হাদীসে নিষেধাজ্ঞা স্বরূপ যেই সম্বোধন রয়েছে তা দ্বারা কেবল তাকে বুঝানো হয়েছে, যে প্রকৃতপক্ষে কুরবানীদাতা আর যাদের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া হয়, তারা এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত নয়। [শারহুল মুমতি, ৭/৪৮৬-৪৮৭]
আবার এমনও লোক দেখা যায়, যারা কুরবানী করতে ইচ্ছুক তাই এই দশকে দাড়ি কাটে না কিন্তু কুরবানী করার পর দাড়ি কেটে ফেলে। এমন লোকের জানা উচিৎ যে, দাড়ি সব সময় রাখাই হচ্ছে মুমিনের কর্তব্য। তা এই দশকে রেখে সওয়াব পাওয়ার আশা করা অযৌক্তিক। অতঃপর কুরবানীর সাথে সাথে দাড়ির কুরবানী একটি শরীয়ত গর্হিত কাজ।
◈ ৬-এই দশকে রক্ত প্রবাহ করা বা রক্ত দেখা নিষেধ মনে করা:
কিছু সমাজে এমনও ধারণা আছে যে, যিল হজ্জ মাসের চাঁদ উঠলে কোনো পশু যবাই করা যাবে না বা রক্ত দেখা যাবে না; যতক্ষণ কুরবানী না দেওয়া হয়। এই কারণে সেই সময় তাদের বাড়িতে মেহমান আসলে তারা মুরগী, ছাগল, গরু ইত্যাদি জবেহ করে মেহমানের আপ্যায়ন না করে গোশত ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আপ্যায়ন করে থাকে। মনে রাখা উচিৎ, হালাল পশু-পাখি সাধারণ লোকদের জন্য সব সময় হালাল। এই দশকে রক্ত প্রবাহ করা যাবে না-মর্মে শরীয়ায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আর শরীয়া যা নিষেধ করে নি তা নিষেধ মনে করাও নিষেধ।
◈ ৭-গরু বা উটে ভাগে কুরবানী করাকে সফরের সাথে নির্দিষ্ট মনে করাঃ
উট ও গরুতে শরীক হয়ে কুরবানী দেওয়া প্রমাণিত।
عن جابر بن عبد الله، قال: حججنا مع رسول الله صلى الله عليه و سلم، فنحرنا البعير عن سبعة، والبقرة عن سبعة. رواه مسلم
আবদুল্লার পুত্র জাবির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হজ্জ করলাম। অতঃপর সাত জনের পক্ষে একটি উট নহর করলাম এবং সাত জনের পক্ষে একটি গাভী। [মুসলিম, অধ্যায়, হাজ্জ, অনুচ্ছেদ নং ৬২, হাদীস নং ৩৫১]
কিন্তু এই রকম ভাগে কুরবানী দেওয়াটা কেবল সফরের সাথে নির্দিষ্ট আর মুকীম অর্থাৎ নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারীরা ভাগে কুরবানী দিতে পারে না মনে করা একটি ভুল ফতোয়া। এমন পার্থক্য না তো হাদীস থেকে বুঝা যায় আর না কোনো সালাফ এমন বলেছেন আর না মুহাদ্দিস ও ফুকাহাগণ করেছেন। তাই এই বিষয়ে এমন পার্থক্য করা একটি অভিনব ও সালাফদের জ্ঞান ও বুঝের বিপরীত ফতোয়া। ফুকাহাদের মধ্যে কেবল লাইস এমন মন্তব্য করলে ইবনু হাযম বলেনঃ ‘এবং লাইস সফরে কুরবানীতে শরীক হওয়া বৈধ মনে করেন। আর এটা এমন তাখসীস/নির্দিষ্টকরণ যার কোন অর্থ হয় না’। [আল্ মুহাল্লা,৪/৩৮১]
প্রকাশ থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যাবতীয় কথা ও কাজ আম তথা ব্যাপক অর্থ বহন করে, যতক্ষণ তা কোনো কিছুর সাথে নির্দিষ্ট না করা হয়।
এটা প্রমাণিত যে, ইসলামে মুসাফিরের জন্য কিছু বিধানে কতিপয় ছাড় ও সুবিধা রয়েছে, যেমন সফর অবস্থায় নামায কসর করা, জুমআর নামায ফরজ না হওয়া, রোযা ছেড়ে দেয়া, মোজার উপর মাসাহ করার সময়-সীমা মুকীমের তুলনায় বেশী থাকা ইত্যাদি। এ জাতীয় যে সব বিষয়ে মুসাফিরের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে তা আমাদের পূর্ববর্তী উলামা ও ফকীহগণ বর্ণনা করে গেছেন কিন্তু তারা কেউই ভাগা কুরবানীকে সফরের বিধানের মধ্যে উল্লেখ করেন নি আর না এমন বলেছেন যে, মুসাফিরদের জন্য ছাড় হল যে, তারা ভাগা কুরবানী দিতে পারে।
◈ ৮-উট কিংবা গরু কুরবানী দেওয়ার সময় সাত ভাগের কোনো ভাগে আক্বীকা উদ্দেশ্য করা:
আক্বীকা একটি এমন ইবাদত, যার সময় নির্ধারিত আর তা হচ্ছে বাচ্চার জন্মের সপ্তম দিন। আর এক হাসান হাদীস অনুযায়ী সাত তারিখে না পারলে ১৪ তারিখে আর তাতেও সম্ভব না হলে ২১ তারিখে। [স্বাহীহুল জামি আস্ স্বগীর ৪০১১] এই ভাবে কুরবানীর সময়ও নির্ধারিত আর তা হল, যিল হজ্জ মাসের ১০ তারিখ এবং ১১, ১২ ও ১৩ তরিখ। যে সব ইবাদত বিশেষ দিন ও তারিখের সাথে সম্পর্কিত তা অন্য দিনে করলে বিদআত ও অগ্রহণীয় বিবেচিত হবে। তাই উপরোক্ত তারিখ ছাড়া অন্য দিনে কুরবানী দিলে কুরবানী হবে না; কারণ কুরবানীর দিন তারিখ শরীয়া কর্তৃক নির্ধারিত। এই ভাবে আক্বীকার দিন-তারিখও নির্ধারিত, তাহলে তা সেই সময়ে না করলে অন্য দিনে করলে কি ভাবে কবুল হতে পারে? শরীয়ত কি কারণ ছাড়াই সেই সময় নির্ধারণ করেছেন? অন্যদিকে যারা সেই নির্ধারিত সময়ে আক্বীকা না দিয়ে কুরবানীর দিনে কুরবানীর ভাগে আক্বীকা দেয়, তারা তাদের সন্তানের আক্বীকা দিতে আন্তরিক তো, না সুযোগের অপব্যবহার করে, কোনোরূপে দায়ভার থেকে মুক্তির চেষ্টা করে?
যারা এই বলে কুরবানীর ভাগায় আক্বীকা দেওয়ার পক্ষপাতী যে, দুটিই নৈকট্যের কাজ তাই একত্রে দেওয়া যায়। তাদের মনে রাখা উচিৎ যে, এমন মন্তব্য দলীলের মুকাবিলায় একটি কিয়াস/অনুমান, যা পরিত্যাজ্য এবং এটাও মনে রাখা উচিৎ যে, কোনও কাজ শুধু নৈকট্যের হলেই গ্রহণীয় হয় না যতক্ষণে তা নবীর তরীকায় সম্পাদন না করা হয়। আর কুরবানীর সাথে আক্বীকা দেওয়া নবীর তরীকা নয়।
◈ ৯-এমন মনে করা যে, একটি ছাগল কিংবা একটি ভেড়ার কুরবানী কেবল এক জনের পক্ষ থেকে হয়; একটি পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হয় না:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে ছাগল কুরবানী দিয়েছেন এবং সাহাবাগণও একটি ছাগল নিজ ও নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে যবাই করতেন, তাতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা যাই হোক না কেন। আবু আইয়্যুব আনসারী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মানুষ তার ও তার বাড়ির সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করতেন, নিজে খেতেন এবং অপরকে খাওয়াতেন’। [তিরমিযী, আযাহী অধ্যায়, নং (১৫০৫)/ইবনু মাজাহ]
উল্লেখ্য যে, সবচেয়ে উত্তম কুরবানী হচ্ছে, একটি পূর্ণ উটের কুরবানী অতঃপর একটি পূর্ণ গরুর কুরবানী অতঃপর একটি পূর্ণ ছাগল কিংবা ভেড়ার কুরবানী অতঃপর উট কিংবা গরুর এক অংশের কুরবানী। [মুগনী ১৩/৩৬৬]
◈ ১০-মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা:
এই প্রসঙ্গটির কয়েকটি দিক রয়েছেঃ
◆ ক- কোনো মৃতের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্ররূপে একটি আলাদাই কুরবানী দেওয়া। যেমন, একটি ছাগল বা গরু বা গরু কিংবা উটের কোনো বিশেষ এক-দুই ভাগ মৃতের জন্য দেয়া। মৃতের জন্য এমন স্বতন্ত্র কুরবানী বৈধ নয়। সত্যিকারে কুরবানীর সুন্নতটি জীবিতদের জন্য এটা মৃতদের জন্য নয়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মৃত প্রিয়া স্ত্রী খাদীজা (রাযিঃ), তাঁর মৃত প্রিয় চাচা হামযা (রাযিঃ) এবং মৃত প্রিয় সন্তানাদির কারোর পক্ষ থেকে কুরবানী দেন নি। বরং তিনি নিজের ও নিজ পরিবারে পক্ষ থেকে কুরবানী দিতেন।
◆ খ-এমন ব্যক্তি যে কাউকে মৃত্যুর পূর্বে অসীয়ত করে যায় যে, সে মারা গেলে তার পক্ষ থেকে যেন সে কুরবানী দেয়, তাহলে সেই মৃত ব্যক্তির অসীয়ত অনুযায়ী এবং তার অসীয়ত বাস্তবায়নে কুরবানী করা বৈধ। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অতঃপর যে ব্যক্তি তা শুনার পর অসীয়তে পরিবর্তন ঘটাবে, তবে তার গুনাহ তাদেরই উপর বর্তাবে, যারা তার পরিবর্তন ঘটাবে।” [সূরা বাক্বারা/১৮১]
আলী (রাযীঃ) হতে প্রমাণিত রয়েছে যে, তিনি দুটি ভেড়া কুরবানী দেন এবং বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অসীয়ত করে গেছেন যেন আমি তার পক্ষ থেকে কুরবানী দেই, তাই আমি তার পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়ে থাকি”। [আবু দাঊদ, তিরমিযী, হাদীটিকে শাইখ আলবানী যয়ীফ বলেছেন]
◆ গ-জীবিতদের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়ার সময় পরিবারের মৃতদেরও সওয়াবে ভাগিদার করার নিয়ত করা। এমন করা একটি বিতর্কিত বিষয়। কেউ এটাকে বৈধ বলেন আর কেউ অবৈধ। বৈধতার পক্ষে দলীল হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানী দিতেন ও বলতেনঃ “হে আল্লাহ! এটা মুহাম্মদের পক্ষ থেকে এবং মুহাম্মদের পরিবারের পক্ষ থেকে”। [মুসলিম] অথচ পরিবারের অনেকেই ইতিপূর্বে মৃত্যু বরণ করেছিল। আর যারা অবৈধ মনে করেন, তাদের নিকট দলীলটি স্পষ্ট নয় এবং তার পরে খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এমন করা প্রমাণিত নয়। [শারহুল মুমতি ৭/৪৭৯-৪৮০]
◈ ১১-কুরবানীর সময় শুধু ১০ম যিল হজ্জকে মনে করাঃ
কুরবানীর সময় ১০ম যিল হজ্জে ঈদের নামায সমাপ্ত হলে শুরু হয় এবং তাশরীকের শেষ দিন অর্থাৎ ১৩ ই যিল হজ্জের সূর্যাস্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যদিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০ম তারিখেই কুরবানী করতেন কিন্তু তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এও বলেছেনঃ “এবং তাশরীকের সমস্ত দিন কুরবানীর দিন”। [আহমদ, স্বহীহুল জামি, আলবানী নং ৪৫৩৭]
তাই কোনো ব্যক্তি যদি ১০ম যিল হজ্জে কোনো কারণে কুরবানী না করতে পারে তাহলে, তাশরীকের যে কোনো দিনে কুরবানী করতে পারে।
◈ ১২-কুরবানীর পশু ক্রয় করার পর যদি তা দোষ যুক্ত হয়ে যায় (যেমন লেংড়া হয়ে যায়, কানা হয়ে যায়..) কিংবা মারা যায় কিংবা হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়, তাহলে তার পরিবর্তে কুরবানী দেওয়া জরুরি মনে করা:
উপরের বিষয়গুলি যদি কুরবানীদাতার অবহেলায় ও তার কারণে ঘটে। যেমন সেই পশুকে এমন ভাবে প্রহার করেছে যে, পা ভেঙ্গে গেছে বা চোখ অন্ধ হয়ে গেছে কিংবা খোলা মাঠে ছেড়ে রেখেছে তাই হারিয়ে গেছে কিংবা যেখানে মানুষ রাতে পশু রাখে সেখানে না রেখে গোয়াল ঘরের বাইরে খোলা স্থানে বেঁধে রাখার কারণে চুরি হয়ে গেছে কিংবা এমন উঁচু স্থানে বেঁধে রেখেছে যেখান থেকে পড়ার আশংকা ছিল, তাই পড়ে মারা গেছে , তাহলে তাকে তার পরিবর্তে অন্য কুরবানী দেওয়া জরুরি। আর যদি তা তার অবহেলায় না ঘটে বরং সে দোষ হীন পশু ক্রয় করেছিল কিন্তু ক্রয় করার পর দোষ যুক্ত হয়েছে, তাহলে তার উপর এর বদলে অন্য কুরবানী জরুরি নয়, সেটা দিলেই যথেষ্ট হবে। এই পার্থক্যের কারণ হল, কোনও পশু যখন কুরবানীর নিয়তে ক্রয় করা হয়, তখন সেটা কুরবানী করা পর্যন্ত তার কাছে আমানত হিসাবে থাকে। আর আমানতের বিধান হল, যদি আমানতদার নিজ অবহেলায় আমানত নষ্ট করে তাহলে তার উপর জামানত/দণ্ড জরুরি হয়। আর যদি তার অবহেলায় তা নষ্ট না হয়, তাহলে তার উপর দণ্ড জরুরি হয় না। [আল মুগনী,১৩/৩৭৩, শারহুল মুমতি,৭/৪৭৫-৪৭৬]
◈ ১৩-অমুসলিমকে কুরবানীর গোশত দেওয়া অবৈধ বা অপছন্দ মনে করাঃ
অমুসলিমকে তার অভাবের কারণে, প্রতিবেশী হওয়ার কারণে এমনকি তার মন জয় করার উদ্দেশ্যে তাকে কুরবানীর গোশত দান করা বা সাদাকা করা বৈধ। হ্যাঁ, তবে সে যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হয়, তাহলে তার বিধান ভিন্ন। [সউদী স্থায়ী উলামা পরিষদের ফতোয়া ১১/৪২৪]
◈ ১৪-জেনে-বুঝে দোষ যুক্ত পশু ক্রয় করাঃ
চার প্রকার দোষ ওয়ালা পশুর কুরবানী বৈধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “ চার প্রকার (দোষ থাকলে) কুরবানীতে বৈধ নয় –অন্য বর্ণনার শব্দে এসেছে যথেষ্ট নয় – স্পষ্ট টেরা, স্পষ্ট রোগা, স্পষ্ট খোঁড়া, অতি দুর্বল (অতি বয়সের কারণে মজ্জাহীন হাড় ওয়ালা) [আবু দাঊদ নং ২৮০২, তিরমিযী নং ১৪৯৭, নাসাঈ ৪৩৬৯]
এই দলীলের আলোকে এটাও বুঝা যায় যে, যেই পশুর দোষ এর থেকেও বেশী ও বড় সেসব পশুর কুরবানীও নাজায়েয। যেমন অন্ধ, পা ভাঙ্গা, চলতে অক্ষম ইত্যাদি।
উপরোক্ত দলীলের আলোকে এটাও বুঝা যায় যে, বর্ণিত দোষ থেকে নিম্ন পর্যায়ের দোষ থাকলে তার কুরবানী বৈধ কিন্তু উত্তম নয়। যেমন কান কাটা, শিং ভাঙ্গা, লেজ কাটা, চামড়া কাটা পশু। এমন দোষ থাকলে তা কুরবানীতে মাকরূহ।
এর পরেও অনেককে দেখা যায়, কিছু মানুষ স্পষ্ট খোঁড়া বা একেবারে বয়স্ক পশু কুরবানীর জন্য খরীদ করে!
◈ ১৫-কুরবানী জবাই করা সংক্রান্ত ভুল সমূহঃ
নিজে যবাই না করে অন্যের মাধ্যমে যবাই করা; অথচ কুরবানী একটি ইবাদত আর ইবাদত নিজে করা বেশী ভাল। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরবানী করতেন। তবে কেউ যদি যবাই করতে ভয় পায় বা ছুরি চালাতে না জনে তাহলে তার বিধান ভিন্ন।
অযু ছাড়া যবাই না করা; অথচ যবাই করার জন্য অযু না তো জরুরি আর না মুস্তাহাব। তাই যবাইয়ের উদ্দেশ্যে অযু জরুরি বা মুস্তাহাব মনে করা বিদআহ। [সউদী স্থায়ী ফতোয়া কমিটি, ১১/৪৩৩-৪৩৫]
কুরবানীর পশুর সামনে ছুরি-চাকু ধার দেওয়া, পশুর সামনে উন্মুক্ত ভাবে তা ধারণ করা, এক অপরের সামনে যবাই করা, যবাই করার পর নিস্তেজ না হতেই চামড়া ছাড়ানো শুরু করা এবং নির্মম ভাবে যবাই করা মারূহ। [হাকেম, ত্বাবারানী, আহমদ, ইবনু মাজাহ (৩১৭২)]

অন্যের কুরবানী যবাই করার সময় তাঁদের নাম লেখা ও তা কুরবানীর পশু যবাই করার পূর্বে পড়া জরুরি মনে করা। যেমন, বলা যে এই গরুতে ৭ জনের নাম দেন। মনে রাখা উচিৎ, যে বা যারা কুরবানীর উদ্দেশ্যে পশুটি ক্রয় করেছে এবং যত ভাগ কুরবানী দেয়ার নিয়ত করেছে, তার সেই নিয়ত অনুযায়ী সে বদলা পাবে এবং তার নিয়ত আল্লাহ অবশ্যই জানেন।
এখন অন্য কোনো ব্যক্তি যদি তাদের কুরবানীটা যবাই করে দেয়, তাহলে সে শুধু কুরবানীদাতার পক্ষ থেকে যবাই করার কাজের প্রতিনিধি মাত্র। বিদায় হজ্জে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রকম ষাটাধিক সাহাবীর কুরবানী করেছিলেন, তাতে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নাম জিজ্ঞেস করেন নি যে, এটা কার কার পক্ষ থেকে, এই উটে তোমরা কতজন শরীক রয়েছো, নাম উল্লেখ কর, ইত্যাদি। বরং তিনি সাধারণ ভাবে যবাই করে গেছেন। তবে এটাও প্রমাণিত যে, তিনি অনেক ক্ষেত্রে যবাই করার পর বলতেনঃ “এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে তাদের পক্ষ থেকে যারা কুরবানী দেয় নি”। [আহমদ, আবু দাঊদ, তিরমিযী] তাই যার কুরবানী অন্য যবাই করছে, সে যবাই দেয়ার সময় বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবারের পর তার নাম বলতে পারে যে এটা অমুক বা অমুক অমুকের পক্ষ থেকে। কিন্তু যবাই করার পূর্বে তা বলার নিয়ম নেই।
কুরবানী দাতা সে একটি পূর্ণ পশু কুরবানী দিক বা ভাগা কুরবানী দিক কুরবানী দেওয়ার সময় সে তা নিজ ও পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে নিয়ত করবে। অর্থাৎ সেই কুরবানীর সওয়াব সকলে পাক, তা নিয়ত করবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাগল কুরবানী দেওয়ার পর বলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা মুহাম্মদ, মুহাম্মদের পরিবার এবং মুহাম্মদের উম্মতের পক্ষ থেকে কবূল কর”। [আহমদ, মুসলিম] এখন যারা প্রতি ভাগে একটা করে নাম নেয়, তারা বুঝাতে চায় যে, এটি এক জনের পক্ষ থেকেই হচ্ছে অন্যরা এর সওয়াব পাবে না; অথচ কুরবানীদাতা তার কুরবানীতে নিজ ও নিজ পরিবার সকলের সওয়াব কামনা করবে, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতেন।

কুরবানীর পশু যবাই করার জন্য বিশেষ কোনো দুআ আছে মনে করা। অথচ সাধারণ পশু যবাই করার সময় যেমন আল্লাহর নাম নেওয়া জরুরি তেমন কুরবানীতেও তাই জরুরি। তাই ‘বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার’ বলে যবাই করলেই হয়ে গেল। যবাই করার পূর্বে (ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া…) বলা ও যবাই শেষে (আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল…) বলা মুস্তাব, জরুরি নয়।
‘বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার’ বলে পশুর গলার চামড়া কেটে দিয়ে কশাইকে বাকি যবাই সম্পন্ন করতে দেওয়া। এটি আসলে কশাইর মাধ্যমে যবাই করা গণ্য হবে। কারণ শারঈ যবাই তখন হবে যখন, পশুর শ্বাসনালী, খাদ্যনালী ও এর দুই পাশের মোটা রগ দুটি কর্তন করা হবে। আর এখানে যবাইকারী ব্যক্তি শুধু চামড়া কাটে আর প্রকৃতপক্ষে যবাইর কাজ কশাই করে। অন্য দিকে এই সময় কশাই সাধারণতঃ আল্লাহর নাম নেয় না।

কশাইকে কুরবানীর গোশত দেওয়া নিষেধ বলতে কশাইকে কাজের মজুরি স্বরূপ দেওয়া নিষেধ বুঝায়। সে তার মজুরি হিসাবে টাকা কিংবা অন্য কিছু নিতে পারে। কিন্তু কুরবানীর গোশত যেমন অন্যকে দান হিসেবে দেয়া মুস্তাহাব তেমন তাকেও দেওয়া মুস্তাহাব।
কুরবানী যবাই করার পর পশুর রক্ত, গোবর, হাড়, চামড়া প্রভৃতি মাটির উপর যেখানে সেখানে ফেলে রাখা যাতে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং মানুষের কষ্ট হয় এমনকি পশুদেরও কষ্ট হয়।

◈ ১৬-কুরবানীর গোশত জরুরি ভিত্তিক তিন ভাগে বিভক্ত করে সমাজকে বিতরণ করতে দেওয়া:
কিছু সমাজে জরুরি ভিত্তিক এমন নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে যে, তাদের গ্রামে বা সমাজে যারাই কুরবানী দিবে, তাদেরকে অবশ্যই তাদের কুরবানীর গোশত তিন ভাগে বিভক্ত করতে হবে। অতঃপর এক ভাগ যতক্ষণ সামাজে জমা না দেওয়া হয় ততক্ষণ তারা বাড়িতে গোশত নিয়ে যেতে পারবে না বা এই ধরণের অন্য নিয়ম।
◉ প্রথমতঃ শরীয়া কুরবানীর গোশতকে তিন ভাগে বিভক্ত করা জরুরি করে নি। “তোমরা নিজে খাও, অপরকে খাওয়াও এবং জমা রাখ”। [বুখারী, আযাহী, নং ৫৫৬৯] এবং অন্য হাদীস “তোমরা নিজে খাও, জমা রাখ এবং দান কর”। [মুসলিম নং ১৯৭১] এই হাদীসদ্বয়ের মাধ্যমে কুরবানীর গোশতের খাত বুঝা যায়, তা আবশ্যিক ভাবে তিনভাগে বিভক্ত করা বুঝায় না।
◉ দ্বিতীয়তঃ “অপরকে খাওয়াও বা সাদাকা কর” সম্বোধনটি প্রত্যেক কুরবানীদাতাকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছে; সমাজ নেতাদের নয়। তাই কুরবানী দাতা নিজে কুরবানীর গোশতের বণ্টন করবে-এটাই হাদীসের মর্ম। কিন্তু সমাজ বিতরণ করার দায়িত্ব নিলে তাদের জন্য এটা বৈধ; তবে জরুরি নয়।
এই সামাজিক নিয়মের সমস্যা হল, তারা জোরপূর্বক মানুষের কাছ থেকে কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক জমা দেয়ার নিয়ম বেঁধে দেয়া হয়। অথচ সাদাকা ও দান আল্লাহর উদ্দেশ্যে খাঁটি মনে স্বেচ্ছায় না দিলে কবুল হয় না। অনুরূপ কারও কাছ থেকে কোনো কিছু জোরপূর্বক নেওয়া এবং তা দান করাও নিষেধ। তাই এই নিয়মে সাদাকা কারীর ইখলাস ও আন্তরিকতা থাকে না ‌বরং থাকে সামাজিকতার অবৈধ চাপ।
এই আবশ্যপালনীয় সামাজিক নিয়মের আর একটি সমস্যা হল, সমাজ যখন কুরবানীর গোশত জমা করে বিতরণ করে, তখন বিভিন্ন গ্রামের ফকির-মিসকিন উপস্থিত হয় এবং তাদের ভাগ্যে আসে দু-চার শ গ্রাম গোশত। তাই তাকে সেই দিনে আবারও ভিক্ষা করার ন্যায় ঘুরতে হয় পাঁ দশ গ্রাম। অথচ প্রত্যেক গ্রামে কুরবানীদাতা স্বয়ং যদি তার আশেপাশে বসবাসকারী পরিচিতদের দুই-চার জনকে গোশত বিতরণ করে এই ভাবে অন্যরাও বিতরণ করে তাহলে গ্রামের সকল অভাবীর বাসায় গোশত পৌঁছে যাবে। তাদেরকে সে দিন লজ্জা, কষ্ট, তিরষ্কার মাথায় নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
আরো একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা আছে যা আমরা অনেকে অনুভব করি না। তা হল, অনেকে একটি ছাগল বা একটি গরুর ভাগ কুরবানী দেয়। তারা খুব বেশী তো ৮/১০ কেচিরেরে গোশত পায়। এর মধ্যে এক তৃতীয়াংশ বা আধা যদি সমাজিক নিয়মের কারণে তাদের দিতে হয়, তাহলে তার কাছে অবশিষ্ট থাকে ৫-৬ কে.জি.। এখন বাড়িতে-৭-৮ জন সদস্য সংখ্যা হলে অনুমান করুন তো তারা দু বেলা তৃপ্তি সহকারে গোশত খেতে পারবে কি? তারা নিজ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের দিতে পারবে কি? তাই এমন বহু লোক ভারাক্রান্ত মনে সমাজের নির্ধারিত অংশ জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে। অথচ এই দিনগুলি পানাহারের দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “তাশরীকের দিনগুলি খান-পান ও আল্লাহর যিকরের দিন”। [মুসলিম, নং ১১৪১] তাই তারা প্রথমে আনন্দ করে খাবে এটা ঈদুল আযহার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। অতঃপর অন্যকেও দিবে। এমন লোক কুরবানী দাতা হলেও তাদের কুরবানীর গোশত হাদিয়া স্বরূপ দেওয়া উচিৎ।
◈ ১৭-কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করাঃ
উল্লেখ্য যে, কুরবানীর পশুর সব কিছুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে, তাই তার কোনো অংশ বিক্রয় নিষেধ। যেমন তার গোশত বিক্রয় নিষেধ তেমন তার চামড়া বিক্রি করাও নিষেধ। আলী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা কুরবানীর উটের দায়িত্ব দেন এবং আদেশ করেন, যেন আমি সেই উটের গোশত, চামড়া, পরিধেয়, সাদাকা/দান করে দেই এবং কশাইকে তা থেকে কিছু না দেই”। [মুসলিম নং ১৩১৭]
তাই স্বয়ং কুরবানীদাতা কুরবানীর চামড়া দ্বারা উপকৃত হবে কিংবা ফকীর মিসকীনকে দান করে দিবে কিংবা কাউকে হাদিয়া করে দিবে। এটাই হবে চামড়ার সঠিক খাদ। কিন্তু যদি সমাজের অবস্থা এমন হয় যে, স্বয়ং কুরবানী দাতা তা ব্যবহার করতে জানে না কিংবা ফকীর মিসকীনরাও চামড়া নেয় না, তাহলে কি করণীয়? এমতাবস্থায় কুরবানীর চামড়া নষ্ট না করে যদি তা বিক্রয় করে অন্যকে দান করা হয়, তাহলে এটা প্রয়োজনার্থে ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বৈধ হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ যার মূল্য রয়েছে তা একেবারে নষ্ট করে দেয়ার চাইতে উপকৃত হওয়া ভাল। তাছাড়া এই ক্ষেত্রে কুরবানীদাতা স্বয়ং সেই চামড়ার মূল্য ভক্ষণকারী নয়; বরং সে সেই মূল্য সাদাকাকারী। হাসান, নাখঈ, আওযায়ী এবং ইমাম আবু হানীফা (রাহেঃ) কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং ইবনে উমার (রাযিঃ) এর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি চামড়া বিক্রি করতেন এবং তার মূল্য সাদাকা করতেন। [মুগনী, ইবনু কুদামাহ ১৩/৩৮২]
উল্লেখ্য যে, কুরবানীর চামড়ার মূল্যের খাত ব্যাপক। কারণ তা সাধারণ সাদাকার অন্তর্ভূক্ত। তাই তা ফকির, মিসকিনকে দেয়া সহ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় যে কোনও সওয়াবের খাতে ব্যবহার করা যাবে। [আল্লাহই ভাল জানেন]